Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeকোয়ান্টাম বিজ্ঞানআলোর অদৃশ্য ধাক্কা

আলোর অদৃশ্য ধাক্কা

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, কোন কিছু চালাতে হলে ভর লাগে, ধাক্কা লাগে। কিন্তু ভরহীন কিছু আবার ধাক্কা দেবে কী করে! আলো অবশ্য সেই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। আলোর ক্ষুদ্র কণা ফোটনের কোনো ভর নেই; তাকে ধরে বেঁধে মাপতে পারলে সেটা শূন্যই পাবেন। তবু আলো যখন কোনো কিছুর ওপর পড়ে, সত্যিকার অর্থে তাকে ধাক্কা দিতে পারে। তার কারণ, আলো শক্তি বহন করে। শক্তি থাকলে তার প্রভাব বস্তুর ওপর পড়ে; এবং সেই প্রভাবকে কাজে লাগানো যায়।

একটি ফোটনের ধাক্কা এতটাই ক্ষুদ্র যে সেটা টের পাওয়া যায় না। কিন্তু লক্ষ-কোটি ফোটন একসঙ্গে কোনো পৃষ্ঠে পড়লে, সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাক্কা যোগ হয়ে বাস্তব বল তৈরি হয়। এই বলকে বলে “রেডিয়েশন প্রেসার” অর্থাৎ আলোর বিকিরণে সৃষ্টি হওয়া চাপ। প্রতিদিন সূর্যের আলো পৃথিবীতে পড়ে, তার তাপ আমরা অনুভব করি। কিন্তু সেই আলোর চাপও আছে, যদিও আমাদের ইন্দ্রিয় সেটা বুঝতে পারে না। কিন্তু মহাকাশে, যেখানে ঘর্ষণ নেই, সেখানে সূর্যের আলোর এই চাপই কাজে লাগে সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে।

লাইট সেইলের মতো বড়, পাতলা, চকচকে একধরনের পর্দা মহাকাশে ছেড়ে দিলে সূর্যের আলো তাতে প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলনের সময় ফোটন দিক বদলায়, আর দিক বদলানো মানে ফোটন নিজের ভরবেগ লাইট সেইলকে দিয়ে দেয়। সেই জমাকৃত ভরবেগের ফলেই পালটিতে ধীরে ধীরে রেডিয়েশন প্রেসার জন্মায়, আর সেই চাপের টানে মহাকাশযান চলতে থাকে কোনো জ্বালানি ছাড়াই। 

২০১০ সালে জাপানের মহাকাশ সংস্থার তৈরি করা ইকারস সৌরপাল প্রথম সফলভাবে  চলেছে। এরপর নাসার লাইটসেইল প্রকল্প দেখিয়েছে, শুধু আলোর ভরবেগ দিয়েই মহাকাশযানের কক্ষপথ বদলানো সম্ভব। এই ধারণা শুধু বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাস্তব হয়েছে তাই নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখাচ্ছে। 

“ব্রেকথ্রু স্টারশট” নামে এক সাহসী পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে, পৃথিবী থেকে শক্তিশালী লেজার ছুড়ে ক্ষুদ্র মহাকাশযানকে আলোর ভরবেগ দিয়ে এমন গতি দেওয়া যাবে, যাতে তারা সূর্যের নিকটতম নক্ষত্র আলফা সেন্টাউরিতে পৌঁছে যেতে পারে মানুষের জীবদ্দশার মধ্যেই, একফোঁটা জ্বালানি ছাড়াই, শুধুমাত্র আলোর ধারাবাহিক ধাক্কায়।

মহাকাশ ছাড়িয়েও আলোর ভরবেগ ক্ষুদ্র জগতেও কাজে লাগে। অপটিক্যাল টুইজার নামে এক আশ্চর্য প্রযুক্তিতে শক্তিশালী লেজার আলো দিয়ে জীবকোষ, ভাইরাস কিংবা ডিএনএর সুতোকে অদৃশ্য হাতের মতো চিমটি দিয়ে ধরা, টানা বা সরানো যায়। এই প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্য আরথার অ্যাশকিন ২০১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। 

সূর্যের আলো যেভাবে মহাকাশের ধূলিকণা উড়িয়ে দেয় বা ধূমকেতুর লেজকে ছড়িয়ে বড় করে, সেগুলোর পেছনেও কাজ করে একই বৈজ্ঞানিক নীতি। এখানে সহজ সত্যটি হলো, আলো কেবল দেখার মাধ্যম নয়, নিজেই একটি প্রয়োগযোগ্য শক্তি। ফোটনের ভর নেই, কিন্তু অন্তর্নিহিত শক্তির কারণে তার ভরবেগ আছে; সেই অদৃশ্য ভরবেগই হয়তো একদিন মানুষকে দূর নক্ষত্রে পাঠানোর সবচেয়ে নিঃশব্দ এবং নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন হয়ে উঠবে।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments