জাপানের হায়াবুসা-২ মহাকাশযান কয়েক বছর আগে রিউগু নামের একটি আদিম গ্রহাণু থেকে সামান্য কিছু ধূলিকণার নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। সম্প্রতি সেই নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জীবনের জিনগত উপাদানের পাঁচটি মূল নিউক্লিওবেসই খুঁজে পেয়েছেন। এগুলো হলো: অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, থাইমিন এবং ইউরাসিল। এই পাঁচটি রাসায়নিক অক্ষর দিয়েই পৃথিবীর সব জীবের ডিএনএ এবং আরএনএ তৈরি হয়েছে।
এই গবেষণাপত্রটি গত ১৬ মার্চ ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী- নেচার অ্যাস্ট্রোনমিতে।
রিউগু গ্রহাণুর নমুনা সংরক্ষণে সতর্কতা
রিউগুর ধূলি কণার নমুনাগুলো পৃথিবীর বাতাস বা মাটির সংস্পর্শে আসার আগেই বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ফলে বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি নিশ্চিত যে, এই অণুগুলো পৃথিবীর দূষণ থেকে মুক্ত ছিল এবং এগুলো সত্যিই রিউগু গ্রহাণুর ভেতরেই ছিল।
অন্যান্য গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের সাথে উপাদানের তুলনা
মজার ব্যাপার হলো, রিউগু শুধু একা নয়। এই গবেষণায় বেনু গ্রহাণু থেকে নাসার আনা নমুনা এবং পৃথিবীতে পতিত মার্চিসন ও অর্গেইল উল্কাপিণ্ডের নমুনার সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। চারটি নমুনাতেই জীবনের মৌলিক রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে, যদিও তাদের অনুপাত একেকটিতে একেক রকম ছিল। অর্থাৎ, জীবনের কাঁচামাল হয়তো কোনো একটিমাত্র গ্রহাণুর বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সৌরজগতের বহু আদিম গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডেই এগুলো ছড়িয়ে ছিল।
মহাকাশে কি প্রাণের সন্ধান মিলেছে?
তাহলে কি আমরা বলতে পারি, মহাকাশে প্রাণের সন্ধান মিলেছে?
এর সহজ উত্তর হল – না।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বুঝতে হবে। নিউক্লিওবেস মানেই জীবন নয়। এগুলো জীবনের বর্ণমালার অক্ষর মাত্র। ভাষার অক্ষর থাকলেই যেমন গল্প লেখা হয়ে যায় না, তেমনি জীবনের রাসায়নিক অক্ষর থাকলেই প্রাণ সৃষ্টি হয় না। কিন্তু গল্প লেখার জন্য যেমন অক্ষর দরকার, তেমনি জীবন তৈরির জন্যও এই নিউক্লিওবেস অণুগুলো অপরিহার্য।
পৃথিবীতে জীবনের রাসায়নিক বীজের আগমন
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সৌরজগতের শুরুর দিকে অসংখ্য গ্রহাণু ও ধূমকেতু পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল। তারা হয়তো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল জীবনের এই রাসায়নিক বীজ। পরে পৃথিবীর সমুদ্র, আগ্নেয়গিরি, বজ্রপাত এবং কোটি কোটি বছরের রাসায়নিক বিবর্তনের মাধ্যমে সেই বীজ থেকেই জন্ম নিয়েছিল জীবনের পূর্বসূরি।
অর্থাৎ, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে যে ডিএনএ এবং আরএনএ কাজ করছে, তার মূল অক্ষরগুলোর ইতিহাস হয়তো শুরু হয়েছিল পৃথিবীর জন্মেরও আগে। হয়তো কোনো আদিম গ্রহাণুর বুকে, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে করতে। মহাকাশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা যে কতটা গভীর সেটা প্রাচীন গ্রহাণু থেকে সংগ্রহ করা ধুলিকণার নমুনা আবারও মনে করিয়ে দিল।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য এখানে ক্লিক করুন
