মহাকাশ অভিযানের দৌড়ে মানুষ সাধারণত চাঁদ আর মঙ্গলগ্রহকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন নজর দিয়েছিল আরও ভয়ংকর এক জায়গায় – শুক্র গ্রহে। শুক্র এমন এক পৃথিবীসদৃশ গ্রহ, যেখানকার তাপমাত্রা সীসা গলিয়ে দিতে পারে, আর বায়ুচাপ পৃথিবীর প্রায় নব্বই গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, শুক্রের আকাশ ঢেকে আছে ঘন সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘে। ফলে সেখানে বৃষ্টি হলেও সেই অ্যাসিড বৃষ্টি মাটিতে পৌঁছানোর আগেই প্রচণ্ড তাপে বাষ্পে পরিণত হয়ে যায়। সেখানে নামা মানে নরক কুন্ডের ভেতর ঝাঁপ দেওয়া। তবু সোভিয়েতরা থামেনি।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ভেনেরা মিশন
ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত তারা শুক্রের উদ্দেশে প্রায় ত্রিশটির মতো মহাকাশযান পাঠায়। অনেকগুলো ব্যর্থ হয়, কিছু মাঝপথে হারিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস গড়ে “ভেনেরা” সিরিজ। ১৯৭০ সালে ভেনেরা-৭ প্রথমবারের মতো শুক্রগ্রহের মাটিতে নেমে সেখান থেকে তথ্য পাঠায়। সেটাই ছিল মানুষের তৈরি কোন মহাকাশযানের অন্য কোন গ্রহে প্রথম সফল অবতরণ। এরপর আসে ভেনেরা-৯, ভেনেরা-১০, আর পরে ভেনেরা-১৩। এরা শুধু অবতরণই করেনি, শুক্রের পৃষ্ঠের ছবি পাঠিয়েছে। ভেনেরা-১৩ তো ইতিহাসের প্রথম রঙিন ছবি পাঠায়। ছবিতে দেখা যায় এক দগ্ধ, আগ্নেয় শিলায় ভরা প্রান্তর, মাথার উপর হলদেটে আকাশ, যেন শুক্রের নয়, নরকের দৃশ্য। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই যন্ত্রগুলো সেই দুঃসহ পরিবেশে টিকে ছিল মাত্র কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু সেই অল্প সময়েই তারা জানিয়ে দেয় শুক্র এক মৃত, উত্তপ্ত, শ্বাসরুদ্ধ গ্রহ। প্রাণের কোন চিহ্ন নেই সেখানে।
শুক্র জয়ে নাসার নতুন অভিযান
কিন্তু শুক্রের গল্প এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পৃথিবীর দৃষ্টি ফিরছে এই রহস্যময় গ্রহটির দিকে। নাসা বর্তমানে দুটি উচ্চাভিলাষী অভিযান, দাভিঞ্চি (DAVINCI) এবং ভেরিটাস (VERITAS) নিয়ে কাজ করছে। দাভিঞ্চি শুক্রের ঘন বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে নেমে এর রাসায়নিক গঠন, নিষ্ক্রিয় গ্যাস, অতীতের পানির অস্তিত্ব এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্যতার সূত্র খুঁজবে। অন্যদিকে ভেরিটাস কক্ষপথ থেকে অত্যাধুনিক রাডারের সাহায্যে পুরো গ্রহের হাই রেজোলিউশনের মানচিত্র তৈরি করবে, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রমাণ খুঁজবে।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির এনভিশন মিশন
প্রায় একই সময়ে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির এনভিশন (EnVision) মিশনও শুক্রের ভূত্বক, অভ্যন্তরীণ গঠন ও বায়ুমণ্ডলকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করবে। এসব অভিযান সফল হলে আমরা জানতে পারব পৃথিবীর প্রায় যমজ এই গ্রহটি কীভাবে একসময় সম্ভাবনাময় জগত থেকে আজকের অগ্নিগর্ভ নরকে পরিণত হলো।
আজ যখন নাসা আর ইউরোপ আবার শুক্রে ফেরার পরিকল্পনা করছে, তখন পুরোনো সোভিয়েত “ভেনেরা” মিশনগুলোকে নতুন চোখে দেখা হচ্ছে। কারণ সত্যি বলতে, শুক্র জয়ের ইতিহাসে এখনো সোভিয়েতদের রেকর্ড অটুট। মঙ্গল হয়তো একদিন হবে মানুষের নতুন ঠিকানা। কিন্তু শুক্র এখনো মহাকাশ অনুসন্ধানের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও কঠিন পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মোটেও সহজ নয়।
