Homeজীবনের বিজ্ঞানএ ডব্লিউ ডি: ধানচাষে মিথেন হ্রাস

এ ডব্লিউ ডি: ধানচাষে মিথেন হ্রাস

বাংলাদেশে বোরো মৌসুম মানেই সেচনির্ভর ধানচাষ। এই সময়টাতে কৃষকের প্রধান ভরসা হলো পানি। জমিতে প্রায় সারাক্ষণ পানি ধরে রাখা হয়। কৃষকের চোখে এটা নিরাপদ। কারণ জমি শুকাবে না, আগাছা দমন হবে আর ধানও হবে ভালো । কিন্তু এই নিরাপদ পদ্ধতির একটি অদৃশ্য মূল্য আছে। সেই মূল্য হলো, মিথেন গ্যাস।

এ ডব্লিউ ডি পদ্ধতি: ধানের জমিতে মিথেন সমস্যার সমাধান

ধানচাষ পৃথিবীর অন্যতম বড় মিথেন উৎস। যখন ধানের জমি দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে থাকে, তখন মাটির ভেতরে অক্সিজেনের অভাব হয়। এই অক্সিজেনশূন্য পরিবেশে কিছু বিশেষ অণুজীব জৈব পদার্থ ভেঙে মিথেন তৈরি করে। সেই গ্যাস ধীরে ধীরে বুদবুদের মতো উঠে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। আর বায়ুমণ্ডলে ‌এই মিথেনের তাপ আটকে রাখার ক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি। তার মানে গ্রীনহাউজ গ্যাস হিসেবে মিথেন কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর।

কিন্তু এই মিথেন সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে – এ ডব্লিউ ডি পদ্ধতি (AWD – অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং)। সহজ ভাষায়, এর মানে হলো জমিতে সবসময় পানি ধরে রাখা হবে না। কিছুদিন পানি থাকবে, তারপর জমিকে কিছুটা শুকাতে দেওয়া হবে। আবার পানি দেওয়া হবে। এই “ভেজা-শুকনা” চক্রটাকেই বলা হয়, এ ডব্লিউ ডি।

এতে কী লাভ? পানি সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষা

জমি যখন কিছুদিনের জন্য শুকিয়ে যায়, তখন মাটির ভেতরে অক্সিজেন ঢুকে পড়ে। ফলে মিথেন তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটাই কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে মিথেন নির্গমন ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেচের পানি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা যায়। অর্থাৎ এক ঢিলে তিন পাখি‌- পানি বাঁচে, খরচ কমে, পরিবেশও রক্ষা হয়।

সমস্যা ও সম্ভাবনা: কৃষকের মনস্তত্ত্ব ও নতুন প্রযুক্তি

বাংলাদেশের ধান বিজ্ঞানীরাও এই প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। ধান গবেষণায় বহুদিন ধরেই এটি আলোচনায় আছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, সেখানে এ ডব্লিউ ডি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে বিজ্ঞানীরা এটাও বলছেন, এই পদ্ধতি সব অঞ্চলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। মাটির ধরন, জমির অবস্থান, সেচের সুযোগ – সবকিছু বিবেচনা করে ব্যবহার করতে হবে। ভুল সময়ে জমি অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলে ফলনে চাপ পড়তে পারে।

আরেকটি বড় বাধা হলো কৃষকের মনস্তত্ত্ব। আমাদের দেশের কৃষক বহুদিন ধরে দেখে এসেছেন, ধানক্ষেতে পানি মানেই নিশ্চিন্তি। তাই জমি শুকনো দেখলে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকের দুশ্চিন্তা হয়। এই মানসিক বাধা ভাঙাটাও বড় চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু ভবিষ্যতের কৃষি বদলাচ্ছে। এখন শুধু ফলন নয়, কার্বনের হিসেবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি ভবিষ্যতে কার্বন বাজারে ধানচাষ যুক্ত হয়, তাহলে এ ডব্লিউ ডি শুধু পানি সাশ্রয়ের প্রযুক্তি থাকবে না, এটা কৃষকের জন্য নতুন আয়ের পথও খুলে দিতে পারে।

আগামীর কৃষি: কার্বন বাজার ও নতুন আয়ের পথ

এখানে আরেকটি অর্থনৈতিক দিকও আছে। যদি এ ডব্লিউ ডি পদ্ধতিতে মিথেন নির্গমন কমানোকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে কৃষক বাড়তি আয়ও করতে পারেন। হিসেব বলছে, প্রতি হেক্টর বোরো জমিতে বছরে গড়ে প্রায় এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন কমানো সম্ভব, যেটা প্রায় একটি কার্বন ক্রেডিটের সমান।

আগামী দিনের কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা হবে না, বরং পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষারও একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে। সেই কৃষিতে একসঙ্গে তিনটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ হবে – খাদ্য উৎপাদন, মাটিতে কার্বন ধরে রাখা, আর প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৃষক শুধু মানুষের খাদ্যই ফলাবেন না, পৃথিবীর ভবিষ্যৎও রক্ষা করবেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular