Homeজীবনের বিজ্ঞানসুপার রাইস: ধানের পরবর্তী বিপ্লব ও আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা

সুপার রাইস: ধানের পরবর্তী বিপ্লব ও আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা

বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে “সবুজ বিপ্লব” পৃথিবীর ধানচাষের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। উচ্চফলনশীল জাত, সেচ আর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে সেই বিপ্লব কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। এখন কৃষিবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামনে আসছে আরেকটি নতুন অধ্যায়, “সুপার রাইস” – এর যুগ।

সুপার রাইস নামটা শুনলে মনে হতে পারে এটি কোনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ফসল। কিন্তু বাস্তবে এটি আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজ ভাষায়, সুপার রাইস বলতে এমন ধানকে বোঝায় যার ফলন অনেক বেশি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী, কম পানি ও সারেও ভালো ফলন দেয়, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপও সহ্য করতে পারে।

তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। “সুপার রাইস” কোনো নির্দিষ্ট জাতের নাম নয়। এটি আসলে একটি লক্ষ্য- একটি ব্রিডিং টার্গেট। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা এমন ধান তৈরি করতে চান যেটা একই জমিতে আরও বেশি ফলন দিতে পারে, কিন্তু কম সম্পদ ব্যবহার করে।

সুপার রাইস ধারণার উৎপত্তি ও লক্ষ্য

এই ধারণার শুরু মূলত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IRRI)-এর গবেষণা থেকে। ১৯৯০-এর দশকে তারা “নিউ প্ল্যান্ট টাইপ” নামে একটি নতুন ধারণা সামনে আনে। এর মূল লক্ষ্য ছিল ধানগাছের হারভেস্ট ইনডেক্স (HI) বাড়ানো। অর্থাৎ গাছের মোট উৎপাদিত জৈব ভরের বড় অংশ যেন দানায় যায়, শুধু পাতা আর কান্ড বাড়ানোর দিকে নয়। কম কুশি, কিন্তু বড় শিষ; কম অপচয়, কিন্তু বেশি ফলন – এটাই ছিল মূল ধারণা।

আর এখানেই আসে বড় প্রশ্ন, সুপার রাইস কি হাইব্রিড হবে, নাকি ইনব্রেড ?

উত্তর হলো, দুটোই হতে পারে। ইনব্রেড ধান হলো সেই ধান যার বীজ কৃষক নিজের জমি থেকে নিয়ে পরের বছর আবার ব্যবহার করতে পারেন। জিনগতভাবে এটি স্থিতিশীল। অন্যদিকে হাইব্রিড ধান তৈরি হয় দুটি ভিন্ন প্যারেন্ট লাইন ক্রস করে। এর ফলে প্রথম প্রজন্মে অতিরিক্ত শক্তি বা “হেটেরোসিস” দেখা যায়, যার কারণে ফলন অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সেই বীজ পরের বছর রেখে আবার লাগালে একই ফলন পাওয়া যায় না।

হাইব্রিড প্রযুক্তি ও নতুন রেকর্ড

IRRI এর প্রথম সুপার রাইস ধারণা ছিল মূলত ইনব্রেড ভিত্তিক। কিন্তু পরে চীন এই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। চীনা কৃষিবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে তৈরি হয় “সুপার হাইব্রিড রাইস”। যেখানে আদর্শ গাছের গঠন আর হাইব্রিড শক্তি একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়।

এই প্রযুক্তি ধানের জগতে এক নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। চীনে পরীক্ষামূলকভাবে হেক্টরপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ টন পর্যন্ত ফলনের রেকর্ড হয়েছে। তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বোরো মৌসুমে গড় ফলন সাধারণত ৪.৫ থেকে ৫.৫ টনের মধ্যে। অর্থাৎ, তাত্ত্বিকভাবে সুপার রাইস সাধারণ ধানের তুলনায় তিনগুণ পর্যন্ত বেশি ফলন দিতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ধান: মেস্টিসো ১২০

তবে শুধু ফলন বাড়ানোই এখন এর লক্ষ্য নয়। নতুন প্রজন্মের সুপার রাইসে এখন খরা সহনশীলতা, লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা, বন্যায় বেঁচে থাকার বৈশিষ্ট্য, এমনকি কম মিথেন নির্গমনের ক্ষমতাও যোগ করা হচ্ছে। কারণ কৃষির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ – মানুষকে খাওয়াতে হবে, আবার পৃথিবীকেও বাঁচাতে হবে।

এই কারণেই ২০২৬ সালে IRRI নতুন প্রজন্মের হাইব্রিড লাইন “মেস্টিসো ১২০” উন্মুক্ত করেছে। এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১২ টনের কাছাকাছি। এর বড় বৈশিষ্ট্য হলো তুলনামূলক কম মিথেন গ্যাস নির্গমন। অর্থাৎ, এটি শুধু বেশি ফলন নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও আরও উন্নত ধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুপার রাইস

বাংলাদেশের জন্য এই প্রযুক্তির গুরুত্ব অনেক। দেশে কৃষিজমি কমছে, জনসংখ্যা বাড়ছে, পানির ওপর চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, নতুন কিছু ব্রি হাইব্রিড লাইনে (যেমন ব্রি হাইব্রিড ধান ৮) অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপ্রতি ১২ টনের বেশি ফলনের সম্ভাবনা দেখা গেছে। এর মানে বাংলাদেশও এখন সুপার রাইসের দৌড়ে ঢুকে পড়েছে।

তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে “সুপার” মানেই জাদু নয়। শুধু ভালো বীজ থাকলেই হবে না। সঠিক সেচ, সুষম সার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা না থাকলে সুপার রাইসও তার পূর্ণ ক্ষমতা দেখাতে পারবে না।

এক কথায়, সুপার রাইস হলো আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তার এক বড় অস্ত্র। পৃথিবীর জনসংখ্যা যখন এক হাজার কোটির দিকে এগোচ্ছে, তখন লড়াইটা আর শুধু জমির পরিমাণ নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন হলো, একই জমি থেকে কত বেশি, কত টেকসই, আর কত পরিবেশবান্ধবভাবে খাদ্য উৎপাদন করা যায়। সেই লড়াইয়ে সুপার রাইস হতে পারে ধানের পরবর্তী বড় বিপ্লব।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular