রাতের আকাশে তাকালে আমরা যে অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি দেখি, তার ভেতরেই নিঃশব্দে ঘুরছে আমাদের নিজস্ব নক্ষত্রের জগত – সৌরজগত। এটা শুধু সূর্য আর তার আটটি গ্রহের পরিবার নয়। এটা সৃষ্টি, ধ্বংস আর পুনর্গঠনের এক দীর্ঘ ইতিহাস। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছরের চলমান এক মহাকাব্য।
সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য। বিশাল এক জ্বলন্ত গোলক, যেখানে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি টন হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন বিপুল শক্তি আলোর কণিকা হয়ে ছুটে যাচ্ছে মহাশূন্যে। সেই আলোই পৃথিবীতে প্রাণের জন্ম দিয়েছে। আর সূর্যের মহাকর্ষ যেন এক অদৃশ্য সুতো, যার টানে বাঁধা পড়ে আছে পুরো সৌরজগত।
এই সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে গ্রহগুলো। কেউ পাথুরে, কেউ গ্যাসের দৈত্য, কেউ বরফের জগত। আর তাদের চারপাশে ঘুরছে ছোট বড় অনেকগুলো উপগ্রহ। এরা নিজেরাও এক একটা ভিন্ন জগত।
সূর্যের কাছাকাছি থাকা বুধ আর শুক্র। এই দুই গ্রহ অবশ্য একা। তাদের কোনো উপগ্রহ নেই। কিন্তু এই নিঃসঙ্গ, দহনজর্জর গ্রহগুলোকেও মানুষ একা থাকতে দেয়নি।
বুধ গ্রহের দিকে প্রথম ছুটে গিয়েছিল মেরিনার-১০ (১৯৭৪-৭৫)। পরে মেসেঞ্জার (২০১১-২০১৫) প্রথমবারের মতো বুধ গ্রহের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি করে। আর এখন বেপি-কলম্বো ছুটে চলেছে বুধ গ্রহকে আরও কাছ থেকে জানার জন্য। এবছরের নভেম্বরে বুধ গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এই মহাকাশযান।
শুক্র গ্রহে অভিযান একসময় ঝড় তুলেছিল। সেই ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেনেরা প্রোগ্রাম প্রথমবারের মতো শুক্রের জ্বলন্ত পৃষ্ঠে নেমে ছবি পাঠায়। সেখানে তাপমাত্রা এত বেশি যে সীসাও গলে যায়। পরে ম্যাগেলান (১৯৯০-১৯৯৪) রেডারের সাহায্যে ঘন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পুরো গ্রহটির পৃষ্ঠ উন্মোচন করে।
এরপর আসে সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ, আমাদের বাসভূমি পৃথিবী। তার একমাত্র উপগ্রহ, চাঁদ। কিন্তু সেই চাঁদ আমাদের সমুদ্রের ঢেউ থেকে শুরু করে দিনের দৈর্ঘ্য পর্যন্ত প্রভাবিত করে। ১৯৬৬ সালে লুনা-৯ প্রথম সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করেছিল। এরপর মানুষের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক আসে যখন ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে মানুষ প্রথম চাঁদের মাটিতে পা রাখে। এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত, একে একে আরো পাঁচটি অ্যাপোলো মিশন চাঁদের বুকে মানুষকে নিয়ে যায়। সবগুলো মিশন মিলিয়ে চাঁদ থেকে মানুষ নিয়ে এসেছে ৩৮২ কিলোগ্রাম শিলাখণ্ডের নমুনা।
আজ আবার নতুন করে চাঁদে ফেরার প্রস্তুতি চলছে। সম্প্রতি সমাপ্ত আর্টেমিস- ২ মিশন সেই পথ তৈরি করেছে, যেটা মানুষকে আবার চাঁদের পথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এর পাশাপাশি ভারতের চন্দ্রযান-৩ এবং চীনের চাং’ই সিরিজের মহাকাশযানগুলো চাঁদের দক্ষিণ মেরুর রহস্য উন্মোচনে এগিয়ে গেছে। আশা করা যায় আগামী এক দশকের মধ্যেই চাঁদে মানুষের স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে উঠবে।
এরপর আসে মঙ্গলগ্রহ। এর গল্প একদম আলাদা। লাল এই গ্রহটি এখন মহাকাশে মানুষের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। মঙ্গলের রয়েছে ছোট্ট দুটো চাঁদ। দেখলে মনে হয় দুটো প্রস্তর খন্ড মঙ্গলের আকর্ষনে বাঁধা পড়ে আছে। এ পর্যন্ত মঙ্গলে সফলভাবে মহাকাশযান পাঠাতে পেরেছে নাসা, সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং চীন।
১৯৭৬ সালে ভাইকিং-১ প্রথম সফলভাবে মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করে। এরপর স্পিরিট, অপরচুনিটি, কিউরিওসিটি, এক এক করে এই রোভারগুলো মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়িয়েছে। আর এখন চলছে পারসিভিয়ারেন্স (২০২১–বর্তমান) এর যুগ। এই রোভার মঙ্গলের বুকে জীবনের চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মঙ্গলের পর থেকেই সৌরজগতের গ্রহগুলো যেন অন্য রূপ নিতে শুরু করে। শুরু হয় গ্যাসীয় দৈত্যদের রাজত্ব। বৃহস্পতি এক বিশাল গ্রহ, যার ভেতরে প্রায় ১৩০০টি পৃথিবী ঢুকে যাবে। এর চারপাশে ঘুরছে ৯৫টিরও বেশি উপগ্রহ। বৃহস্পতি নিজেই যেন ছোটখাটো একটি সৌরজগত। ২০১৬ সাল থেকে জুনো প্রোব এই দৈত্য গ্রহকে নতুন চোখে আমাদের দেখাচ্ছে, আর তার আগে গ্যালিলিও (১৯৮৯ – ২০০৩) দীর্ঘদিন ধরে বৃহস্পতির রহস্য উন্মোচন করেছে।
তারপর আসে শনি। তার বলয় যেন এক অপার্থিব শিল্পকর্ম। শনির রয়েছে ১৪৫টিরও বেশি উপগ্রহ। ২০০৪ সালে ক্যাসিনি–হাইগেন্স এই গ্রহের জটিল জগতকে উন্মোচন করে। এরপর শনির উপগ্রহ টাইটানে নেমে হাইগেন্স আমাদের দেখিয়েছে, পৃথিবীর বাইরে অন্য রকমের আবহাওয়াও সম্ভব।
আরও দূরে রয়েছে ইউরেনাস আর নেপচুন। শীতল, অন্ধকার, রহস্যময় জগৎ। এখন পর্যন্ত এই দুই গ্রহকে কাছ থেকে দেখার একমাত্র সুযোগ এনে দিয়েছে ভয়েজার- ২।
এরপর সৌরজগতের একদম প্রান্তে পৌঁছে গেছে নিউ হরাইজনস। ২০১৫ সালে প্লুটোর পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে সেই বিখ্যাত “হৃদয়-আকৃতির” অঞ্চলের ছবি তুলে পাঠিয়েছে। সেই ছবি আমাদের দেখিয়েছে সৌরজগতের শেষ প্রান্তের ছোট্ট এই জগতটিও কত সুন্দর। আর মজার ব্যাপার হলো, বামন গ্রহ প্লুটোরও পাঁচটি চাঁদ রয়েছে।
মানুষের অভিযান শুধু গ্রহেই থেমে নেই। গ্রহাণুর দিকেও মানুষ হাত বাড়িয়েছে। ২০০১ সালে নিয়ার-শুমেকার প্রথমবারের মতো একটি গ্রহাণুতে অবতরণ করে। এরপর হায়াবুসা (২০০৫-২০১০), হায়াবুসা-২ (২০১৮-২০২০) এবং ওসিরিস-রেক্স (২০১৮-২০২৩) গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে পৃথিবীতে। আর ২০২২ সালে ডার্ট মিশন দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ চাইলে একটি গ্রহাণুর গতিপথও বদলাতে পারে।
সৌরজগতে দীর্ঘ যাত্রার নীরব সাক্ষী হলো ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণের পর এরা এখন সৌরজগতের হেলিওস্ফিয়ার পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক অঞ্চলে প্রবেশ করেছে।
এখানে বলে রাখি, সৌরজগতে মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখানে ছড়িয়ে আছে গ্রহাণুপুঞ্জ। এর বাইরে কুইপার বেল্ট, আর আরও অনেক দূরে ওর্ট মেঘ। যেখান থেকে ধূমকেতুরা সূর্যের টানে চলে আসে, সৌরজগতের শৈশবের স্মৃতি বহন করে।
প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে সৌরজগতের এই পুরো ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল একটি ঘূর্ণায়মান ধূলি আর গ্যাসের মেঘ থেকে। সেই মেঘ ধীরে ধীরে চ্যাপ্টা হয়ে একটি ডিস্কে পরিণত হয়েছিল, আর সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে সূর্য এবং তার গ্রহ, উপগ্রহ। তাই আজও তারা প্রায় একই সমতলে, একই দিকে ঘোরে- প্রাচীন এক ঘূর্ণনের স্মৃতি বহন করে।
তবে সৌরজগত কিন্তু নিখুঁত নয়। এখানে আছে সংঘর্ষের দাগ, অদ্ভুত কক্ষপথ, উল্টো ঘূর্ণন, আর অসংখ্য অজানা প্রশ্ন। শুক্রগ্রহ অন্যান্য গ্রহের বিপরীতে উল্টো দিকে ঘোরে, যেন কেউ তার ঘূর্ণনের দিকটাই বদলে দিয়েছে। আবার ইউরেনাস প্রায় ৯৮ ডিগ্রি হেলে নিজের কক্ষপথে গড়িয়ে চলে, যেন একসময় কোনো বিশাল সংঘর্ষ তাকে একেবারে কাত করে দিয়েছে। বুধ গ্রহের কক্ষপথও পুরোপুরি স্থির নয়। এটি সূর্যের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে সামান্য করে সরতে থাকে, যেটা একসময় বিজ্ঞানীদের বড় ধাঁধায় ফেলেছিল। পরে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এই রহস্যের সমাধান দিয়েছিল।
আমাদের পৃথিবীর চাঁদের জন্মও সম্ভবত এক বিশাল সংঘর্ষের ফল, সৃষ্টির আদি লগ্নে বিশাল আকারের একটি বস্তু প্রাচীন পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল। এইসব বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গড়ে উঠেছে সৌরজগতের এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো আমরা শুধু এই গল্পের পাঠক নই। আমরা এখন এই গল্পের পার্শ্ব চরিত্র। একসময় আমরা আকাশের দিকে শুধুই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। কিন্তু আজ আমরা সেই বিস্ময়ের ভেতরেই হাঁটছি।
আর আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় চমক। আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে আবার মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। ইউরোপা ক্লিপার বৃহস্পতির বরফঢাকা উপগ্রহের ভেতরের সমুদ্রের রহস্য খুঁজবে। আর ড্রাগনফ্লাই উড়ে বেড়াবে শনির উপগ্রহ টাইটানের আকাশে। এভাবেই একসময় সৌরজগতই হয়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথ চলার অংশ, মানুষের নতুন ঠিকানা। সেই দিন হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়।
