Homeমহাবিশ্বের মহাবিস্ময়মহাজাগতিক স্কেল বনাম মানুষের অর্থনীতি: সূর্যের ভরের সমান টাকা কি পৃথিবীতে থাকা...

মহাজাগতিক স্কেল বনাম মানুষের অর্থনীতি: সূর্যের ভরের সমান টাকা কি পৃথিবীতে থাকা সম্ভব?

আমরা সবাই হয়তো জীবনে কখনো না কখনো অঢেল টাকার স্বপ্ন দেখেছি। কেউ হয়তো বিলিয়নিয়ার হতে চান, কেউবা ট্রিলিয়নিয়ার। কিন্তু আপনার কল্পনা যদি সব সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশের স্কেলে চলে যায়? ধরুন, আপনার কাছে সূর্যের ভরের সমান সংখ্যার টাকা আছে! সংখ্যাটা শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, চলুন বিজ্ঞানের আর অর্থনীতির চশমা দিয়ে দেখি, বাস্তবে এই পরিমাণ টাকা পৃথিবীতে থাকা বা রাখা সম্ভব কি না।

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: না, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেন? চলুন ধাপে ধাপে এই মহাজাগতিক রহস্য আর পৃথিবীর অর্থনীতির এক দারুণ তুলনামূলক যাত্রায় ঘুরে আসি।

১. ২-এর পর ৩০টি শূন্যের দানবীয় সংখ্যা!

প্রথমে জেনে নিই সংখ্যাটা আসলে কত বড়। সূর্যের ভর হলো আনুমানিক $2 \times 10^{30}$ কেজি। মানে ২-এর পর ঠিক ৩০টি শূন্য বসালে যে সংখ্যা হয়!

আপনি যদি এই ভরকে টাকায় বা ডলারে রূপান্তর করেন, তবে এটি এমন একটি সংখ্যা দাঁড়ায়, যা মানুষের তৈরি যেকোনো অর্থনৈতিক স্কেলের বহু ঊর্ধ্বে। এটি মিলিয়ন, বিলিয়ন বা ট্রিলিয়ন নয়; একে বলা যায় ২ ননিলিয়ন (Nonillion)। খাতায় লিখতে গেলে দেখতে হবে ঠিক এমন: ২,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টাকা!

২. পৃথিবীর সব সম্পদ বনাম সূর্যের “সম্পদ”

ধরুন, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জমানো ক্যাশ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, শেয়ার বাজার, ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে শুরু করে সমস্ত সোনাদানা, হীরা, আর জমিজমা—সবকিছু একসাথে জড়ো করা হলো। এই গ্লোবাল ওয়েলথ (Global Wealth) বা পৃথিবীর মোট সম্পদের আনুমানিক মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার বা $5 \times 10^{14}$ ডলার

এখন একটু তুলনা করে দেখুন:

  • সূর্যের ভরের স্কেল: $10^{30}$

  • পৃথিবীর মোট সম্পদের স্কেল: $10^{14}$

পার্থক্যটা দাঁড়ায় $10^{16}$ গুণ (অর্থাৎ ১০ কোয়াড্রিলিয়ন গুণ)! এটি এতই বিশাল এক ব্যবধান যে, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ যদি একটি বালুকণা হয়, তবে সূর্যের ভরের ওই সংখ্যাটি হবে পুরো সাহারা মরুভূমি!

৩. শুধু কাগজের নোট ছাপালে কী হবে? এক মহাজাগতিক বিপর্যয়!

অনেকের মনে হতে পারে, “পৃথিবীতে এত সম্পদ নেই তো কী হয়েছে, আমরা টাকা ছাপিয়ে নেব!”

চলুন, একটা ভয়ংকর মজার হিসাব করি। ধরুন, আপনি ১ ডলারের বা টাকার নোট দিয়ে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ বানাতে চান। একটি কাগজের নোটের ভর প্রায় ১ গ্রাম।

  • আপনি যদি সূর্যের ভরের সমান সংখ্যক ($10^{30}$টি) নোট ছাপান, তবে সেই নোটগুলোর মোট ভর হবে $10^{27}$ কেজি

  • কিন্তু আমাদের এই পুরো পৃথিবীর ভরই হলো মাত্র $6 \times 10^{24}$ কেজি!

এর মানে কী দাঁড়ালো? আপনার ছাপানো কাগজের নোটগুলোর ভর আমাদের আস্ত পৃথিবীর ভরের চেয়েও প্রায় ১ লক্ষ ৬৬ হাজার গুণ বেশি হবে! পৃথিবীতে এত নোট রাখার তো জায়গাই নেই, উল্টো এই টাকার পাহাড়ের নিজস্ব এক বিশাল মহাকর্ষ বল তৈরি হবে। এটি পৃথিবীকে তো গুঁড়িয়ে দেবেই, এমনকি এত বিপুল ভরের কারণে এই টাকার স্তূপটি নিজের চাপেই সংকুচিত হয়ে একটি নতুন গ্রহ বা নক্ষত্রে পরিণত হতে পারে!

৪. অর্থনীতিতে ধস: টাকার মান হয়ে যাবে পুরোপুরি শূন্য

কাগজের পাহাড় না বানিয়ে যদি আমরা পুরোটাই ডিজিটাল মানি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখি? তাহলেও রক্ষা নেই।

টাকার মান হাওয়া থেকে আসে না; এটি আসে দেশের উৎপাদন, পণ্য, সেবা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে। পৃথিবীতে যদি হঠাৎ করে এত টাকা চলে আসে, তবে টাকার মান মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি শূন্য হয়ে যাবে। অর্থনীতিতে একে বলা হয় হাইপারইনফ্লেশন (Hyperinflation)

যেহেতু এত বিপুল টাকার বিপরীতে পৃথিবীতে কোনো পণ্য বা সম্পদ নেই, তাই তখন এক কাপ চা বা এক টুকরো পাউরুটি কিনতে হয়তো আপনাকে কয়েক ট্রিলিয়ন টাকা খরচ করতে হবে। টাকা তখন কেবল অর্থহীন কিছু সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।

৫. পৃথিবীর সব সোনা গলালে কতটুকু হবে?

সংখ্যার স্কেলটা আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সোনার হিসাবটা দেখা যাক। মানব ইতিহাসে আজ পর্যন্ত যত সোনা খনন করা হয়েছে (ফারাওদের আমল থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত), তার মোট পরিমাণ প্রায় ২ লক্ষ টন

সোনার ঘনত্ব অনেক বেশি। আপনি যদি পৃথিবীর সমস্ত সোনা (মানুষের গয়না, ব্যাংকের রিজার্ভ সব) গলিয়ে একটি নিরেট ঘনক (Cube) তৈরি করেন, তবে তার প্রতিটি পাশ হবে মাত্র ২১ থেকে ২২ মিটার। অর্থাৎ:

  • এটি দেখতে একটি ৭ তলা বিল্ডিংয়ের মতো উঁচু হবে।

  • জায়গা নেবে একটি টেনিস কোর্টের অর্ধেকের মতো।

ভাবা যায়? পৃথিবীর সমস্ত সোনা একসাথে করলেও তা কেবল মাঝারি আকারের একটি বাড়ির সমান! আর অন্যদিকে সূর্যের ভর পৃথিবীর সব সোনার চেয়ে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বেশি।

৬. স্কেল বোঝার সেরা উদাহরণ: সূর্য যদি একটি ফুটবল হয়!

মহাবিশ্বের বিশালতা কতটা অকল্পনীয়, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি চমৎকার মডেল ব্যবহার করেন।

ধরুন, বিশাল সূর্যকে আমরা ছোট করে একটি সাধারণ ফুটবলের আকারে নিয়ে এলাম।

  • তাহলে আমাদের এই বিশাল পৃথিবীটা কত বড় হবে জানেন? পৃথিবী হয়ে যাবে মাত্র ২.২ মিলিমিটারের একটি ছোট বিন্দুর মতো—ঠিক যেন একটি সরিষার দানা বা আলপিনের মাথার সমান!

  • আর দূরত্ব? সেই ফুটবল (সূর্য) থেকে সরিষার দানা (পৃথিবী)-কে রাখতে হবে প্রায় ২৪ মিটার (প্রায় ৭৮ ফুট) দূরে!

অর্থাৎ, একটি ফুটবল মাঠের এক গোলপোস্টে যদি ফুটবলটিকে রাখেন, তবে পৃথিবী নামের ওই সরিষার দানাটি থাকবে মাঠের বেশ কিছুটা দূরে। আর মাঝখানের এই পুরো জায়গাটা? একদম ফাঁকা! এটাই হলো মহাকাশের আসল রূপ।

মানুষের অর্থনীতি, সম্পদ, সোনা, টাকা—সব মিলিয়ে আমাদের যে চেনা জগৎ, গ্রহ বা নক্ষত্রের ভরের স্কেলের তুলনায় তা অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র আর নগণ্য। এই কারণেই মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন:

“Human scale numbers vs cosmic scale numbers are fundamentally different universes.”

(মানুষের স্কেলের সংখ্যা এবং মহাজাগতিক স্কেলের সংখ্যা মূলত সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জগৎ।)

মহাবিশ্ব আমাদের শেখায় যে, আমরা এই বিশাল শূন্যতায় কতটা ক্ষুদ্র, আবার এই অসীম শূন্যতাকে নিজের মস্তিষ্কে ধারণ করার ক্ষমতায় আমরা কতটা অনন্য!

Raisul Sohan
Raisul Sohan
বিজ্ঞান অনুরাগী। শখের বিজ্ঞান লেখক।
RELATED ARTICLES

Most Popular