Homeমহাবিশ্বের মহাবিস্ময়মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: মহাকাশে নক্ষত্রখেকো এক ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: মহাকাশে নক্ষত্রখেকো এক ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল

মহাকাশে নক্ষত্র গিলে খাওয়ার বিরল ঘটনা

পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে একটি মহাজাগতিক অঘটন ঘটেছে। বিশাল এক ব্ল্যাকহোল একটি নিরীহ নক্ষত্রকে গিলে ফেলেছে। দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন নক্ষত্রটিকে টেনে হেঁচড়ে নিজের মধ্যে নিয়ে নিচ্ছে। এই ধরনের অদ্ভুত, রোমহর্ষক ঘটনাটিকেই বিজ্ঞানীরা বলেন “টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট”, সংক্ষেপে TDE। সম্প্রতি হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এই নাটকীয় দৃশ্যটি ধারণ করেছে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাটিকে শনাক্ত করেছেন AT2024tvd নামে।

ব্ল্যাকহোলের ভয়ানক স্প্যাগেটিফিকেশন প্রক্রিয়া

ঘটনাটি শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। ক্যালিফোর্নিয়ার জুইকি ট্র্যানজিয়েন্ট ফ্যাসিলিটিতে প্রথমে একটি উজ্জ্বল আলোর ঝলক দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চমকে ওঠেন। এই আলোর উৎস আসলে ছিল একটি নক্ষত্র। যাকে একটি ব্ল্যাকহোল টেনে ছিঁড়ে গ্যাসের লম্বা ফিতায় পরিণত করছে। কোন নক্ষত্রকে এইভাবে ছিঁড়ে ফেলে টেনে নেওয়াকেই বলে “স্প্যাগেটিফিকেশন”। নক্ষত্রের দেহ দেখতে তখন হয় ঠিক যেন স্প্যাগেটির মতো দড়ি টানা টানা।

মহাকাশ গবেষণাগারে ধরা পড়া অস্বাভাবিক অবস্থান

এরপর, নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ, চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি আর ভেরি লার্জ অ্যারে একযোগে নজর রাখে এই ঘটনাটির ওপর। দেখা যায়, একটি অস্বাভাবিক জায়গা থেকে আসছে এই TDE। সাধারণত ব্ল্যাকহোল থাকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। কিন্তু এটাকে দেখা গেছে তার নিজস্ব গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৬০০ আলোকবর্ষ দূরে, এক কোণার দিকে। আর এখানেই এই ঘটনাটির বিশেষত্ব।

ভবঘুরে ব্ল্যাকহোলের রহস্যময় যাত্রা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা সম্ভবত একটি “ভবঘুরে” ব্ল্যাকহোল। অর্থাৎ, আগে এটি হয়তো অন্য কোনো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ছিল। পরে এক বা একাধিক গ্যালাক্সির সংঘর্ষে সেখান থেকে ছিটকে পড়ে এখন এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা একদম বিরল ঘটনা, কারণ সাধারণত ব্ল্যাকহোল গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে এত দূরে থাকে না। আর এত স্পষ্টভাবে এই ভবঘুরে ব্ল্যাকহোলের উপস্থিতি এই প্রথম ধরা পড়ল।

গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে দুই ব্ল্যাকহোলের সহাবস্থান

এই ব্ল্যাকহোলের ভর প্রায় ১০ লাখ সূর্যের সমান বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে গ্যালাক্সিতে এটি রয়েছে, তার কেন্দ্রেও আরেকটি দানব ব্ল্যাকহোল রয়েছে। আর সেটির ভর প্রায় ১০ কোটি সূর্যের সমান। এত বড় দুটি ব্ল্যাকহোল একই গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা এবং একটির কেন্দ্র থেকে সরে বাইরে চলে আসা, অত্যন্ত বিরল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট

এই ধরনের টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট বিজ্ঞানীদের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। যেমন: সব ব্ল্যাকহোল কী গ্যালাক্সির মাঝখানে থাকে? না কী অনেকেই গ্যালাক্সির ভেতরে ঘুরে বেড়ায়? কোনো ব্ল্যাকহোল কীভাবে নক্ষত্রকে গিলে ফেলে, কী ধরনের বিকিরণ তখন বের হয়, এসব তথ্য এ ধরনের ঘটনাগুলো থেকে জানা যায়।

মহাবিশ্বের অজানাকে জানার নতুন দিগন্ত

এই ঘটনাটি প্রমাণ করল, ব্ল্যাকহোল শুধু গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নয়, গ্যালাক্সির ভেতরেও ঘুরে বেড়াতে পারে। AT2024tvd সেই ভবঘুরে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করল। মহাবিশ্বের অজানাকে জানতে বিজ্ঞানীদের জন্য এটি একেবারেই একটি অসাধারণ ঘটনা।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular