মেধাস্বত্ব কী?
বাংলা ভাষায় মেধাস্বত্ব বলে একটি শব্দ চালু রয়েছে। আপনি হয়তো ভাবছেন, আমসত্ত্ব অনেক খেয়েছি কিন্তু মেধাস্বত্ব ব্যাপারটি আবার কি ? একটু খোলাসা করে বলছি। মনে করুন, আপনি আপনার মেধা খাটিয়ে একটা বই লিখলেন, অথবা একটি নুতন যন্ত্র আবিষ্কার করলেন কিম্বা একটি সুন্দর গান গেয়ে রেকর্ড করলেন। নিজের সৃজনশীলতায় আপনি নিজেই মুগ্ধ।
সৃজনশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা
কিন্তু কদিন পর দেখলেন, আপনার সৃষ্টি আপনার হাতছাড়া হয়ে গেছে। অন্য কেউ সেটি নিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে এবং বাজারজাত করছে। আপনি নিশ্চয়ই খুশি হবেন না তাতে। আপনি চাইবেন আপনার সৃষ্টির মালিকানা আপনার নিজের কাছেই থাকুক। তাহলে জেনে খুশি হবেন যে মেধাস্বত্ব ব্যাপারটি এজন্যই চালু হয়েছে। ইংরেজিতে একে বলে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা সংক্ষেপে – আই পি ।
কপিরাইট আইন ও তার কার্যকারিতা
শুধুমাত্র সৃজনশীল মানুষকে খুশি করার জন্যই মেধাস্বত্ব ব্যাপারটি চালু হয়েছে বললে ভুল হবে। তারচে বলা উচিত মানুষের মননশীলতার অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করার জন্যই মেধাস্বত্ব আইন প্রচলন হয়েছে। এই আইন না থাকলে লেখকরা নুতন নুতন বই লিখতে আগ্রহী হতেন না। প্রকাশকরাও সেগুলো ছাপাতো না। বিজ্ঞানীরা নুতন নুতন আবিস্কার করার জন্য অনুপ্রেরণা পেতেন না। আপনি হয়ত ভাবছেন, সৃজনশীলতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, মানুষ এগুলো এমনিতেই করতো। তা হয়তো ঠিক। কিন্তু সেটি হতো সীমিত আকারে । একজন লেখক যখন দেখতো তাঁর লেখা বই অন্যজনে ছাপিয়ে দেদারসে বিক্রি করে যাচ্ছে আর উনি ফুটো পয়সাটাও পাচ্ছেন না তখন উনি দ্বিতীয় বইটা লিখতেন কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু কপিরাইটের আইনের কারনে সেটি অনেকাংশে সম্ভব নয়। কোন লেখকের জীবনকাল থেকে মৃত্যুর ষাট বছর পর্যন্ত বইয়ের মালিকানা লেখকের থাকে। এরপর যে কেউ সেটি ছাপাতে পারে। এক্ষেত্রে অনুমতির কোন প্রয়োজন হয় না। যেমন আপনি এখন ইচ্ছে করলেই রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ারের লেখা ছাপাতে পারবেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের লেখা ছাপাতে পারবেন না। কারণ হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর এখনো ষাট বছর পার হয়নি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এবং শেক্সপিয়ারের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে।
পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও প্লান্ট ব্রিডার্স রাইটস
একই কথা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও খাটে। কোন নুতন আবিস্কার পেটেণ্ট করা যায় সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত। এই সময়ে আবিষ্কারকের অনুমতি ছাড়া তাঁর আবিষ্কৃত কোন পদ্ধতি বা যন্ত্রপাতি বাণিজ্যিকীকরণ করা যাবে না। বাজারে আমরা যেসব ট্রেডমার্ক দেখি, সেগুলোও এক ধরনের মেধাস্বত্ব। ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রে অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। কোন কোম্পানি যতদিন তাদের ট্রেডমার্ক রিনিউ করবে ততদিন অন্য কেউ সেই ট্রেডমার্ক ব্যবহার করতে পারবে না। সেজন্য আপনি চাইলেই কোন কোমল পানীয়কে কোকাকোলা বলে বাজারে চালাতে পারবেন না। করলে নির্ঘাত মামলায় পড়বেন। এখানে বলে রাখি, নুতন জাতের উদ্ভিদের জন্য ব্রিডার তাঁর মালিকানা দাবি করতে পারেন। একে বলে প্লান্ট ব্রিডার্স রাইটস বা পি বি আর। এর স্থায়িত্ব সাধারণত ২০ বছর। কোন কোন ক্ষেত্রে এটি ২৫ বছরও হতে পারে। এটিও এক ধরনের মেধাস্বত্ব। এই সময়ে ব্রিডারের অনুমতি ছাড়া নতুন জাতের উদ্ভিদটি বাজারজাত করা যাবে না। নতুন কোন ডিজাইনের ক্ষেত্রেও মেধাস্বত্বের বিধান রয়েছে।
মেধাস্বত্বের গুরুত্ব ও জনসচেতনতা
যে কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মেধাস্বত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। কোন দেশে মেধাস্বত্ব সুরক্ষিত হলে, সে দেশে উন্নয়ন গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এজন্য উন্নত দেশগুলোতে মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর প্রয়োগ দেখা যায়। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পাইরেসি রোধে মেধাস্বত্ব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। আমাদের বাংলাদেশেও কপিরাইট, পেটেন্ট এবং ট্রেডমার্ক আইন চালু আছে। কিন্তু আইন গুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। তাছাড়া এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে স্বচ্ছ ধারণা নেই। মেধাস্বত্ব নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার।
