আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) জানালা দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছেন একজন নভোচারী। নীল-সাদা মার্বেলের মতো সুন্দর আমাদের এই গ্রহ। স্টেশনের ভেতরে সবকিছু ভাসমান—পানির ফোঁটা থেকে শুরু করে নভোচারীর নিজের শরীরটাও। পৃথিবীর মায়া, অর্থাৎ অভিকর্ষ বলের টান সেখানে নেই। বাইরে থেকে দেখলে এই ওজনহীন জীবনকে এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা বলে মনে হয়। কিন্তু এই জাদুকরী অভিজ্ঞতার আড়ালে, নভোচারীর শরীরের একেবারে গভীরে—মাথার খুলির ভেতর ঘটে চলেছে এক নিঃশব্দ, অবিশ্বাস্য রূপান্তর।
মহাকাশভ্রমণ মানুষের শরীরের ওপর ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। আর এই কৌতূহল থেকেই সম্প্রতি এক রোমাঞ্চকর আবিষ্কার করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডার একদল গবেষক।
খুলির ভেতর ভাসমান মগজ
পৃথিবীতে থাকতে আমাদের মস্তিষ্ক এক অদৃশ্য সুতোর টানে বাঁধা থাকে, যার নাম অভিকর্ষ বল। এটি সবসময় আমাদের নিচের দিকে টেনে রাখে। কিন্তু মহাকাশে সেই টান যখন উধাও হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক আর আগের জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। খুলির ভেতরে থাকা তরলের (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) মাঝে এটি অনেকটা স্বাধীনভাবে ভাসতে শুরু করে।
গবেষক তিয়ানি ওয়াং এবং তার দলের সাম্প্রতিক (২০২৬) এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। তারা দেখলেন, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে মানব মস্তিষ্ক তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে ধীরে ধীরে ওপরের এবং পেছনের দিকে সরে যেতে শুরু করে!
২ মিলিমিটারের মহাজাগতিক যাত্রা
এই পরিবর্তনটি কীভাবে ঘটে, তা বোঝার জন্য গবেষক দল এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নেন। তারা ২৬ জন নভোচারীর মহাকাশে যাওয়ার আগের এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার পরের এমআরআই (MRI) স্ক্যানগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলনা করেন।
আগে বিজ্ঞানীরা পুরো মস্তিষ্ককে একটি একক বস্তু হিসেবে মাপতেন। কিন্তু ওয়াং এবং তার দল মস্তিষ্ককে ১০০টিরও বেশি ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করে ফেলেন। তাদের এই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে ধরা পড়ে এক বিস্ময়কর সত্য—যে নভোচারীরা প্রায় এক বছর মহাকাশ স্টেশনে কাটিয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কের ওপরের দিকের অংশগুলো প্রায় ২ মিলিমিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে গেছে!
ভাবছেন, মাত্র ২ মিলিমিটার আর এমন কী? কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানের জগতে এটি এক বিশাল পরিবর্তন। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, মস্তিষ্কের যে অংশগুলো আমাদের শরীরের নড়াচড়া (Movement) এবং অনুভূতি (Sensation) নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক সেই অংশগুলোতেই এই বিচ্যুতি সবচেয়ে বেশি প্রকট।
মগজের জ্যামিতিক বিভ্রম: কেন আগে ধরা পড়েনি?
এখানেই গল্পের সবচেয়ে রহস্যময় বাঁক। মস্তিষ্কের এই স্থানচ্যুতি এর আগে বিজ্ঞানীদের চোখ এড়িয়ে গেল কীভাবে?
গবেষকরা লক্ষ্য করলেন, মস্তিষ্ক কেবল ওপরের দিকেই ওঠে না, এটি এক অদ্ভুত জ্যামিতিক সংকোচনের ভেতর দিয়ে যায়। মহাকাশে থাকার সময় মস্তিষ্কের দুই পাশের অংশগুলো একে অপরের দিকে, অর্থাৎ মাঝখানের দিকে চেপে আসে। ডান ও বাম পাশের এই প্রতিসম সংকোচনের ফলে মস্তিষ্কের সামগ্রিক আয়তন বা ভলিউম মাপলে মনে হয় যেন কোনো পরিবর্তনই হয়নি! এই জ্যামিতিক বিভ্রমের কারণেই আগের অনেক সাধারণ গবেষণায় মস্তিষ্কের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো বিজ্ঞানীদের রাডারে ধরা পড়েনি।
পৃথিবীতে ফেরা: অভিকর্ষের চেনা টান
এক বছর পর নভোচারী যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তখন আবার পৃথিবীর অভিকর্ষ বল তাকে স্বাগত জানায়। শুরু হয় শরীর ও মস্তিষ্কের পুরনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার লড়াই।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পৃথিবীতে ফেরার ছয় মাসের মধ্যেই মস্তিষ্কের ওপর-নিচের (Up-down) যে পরিবর্তন হয়েছিল, তা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। অভিকর্ষ বল মস্তিষ্ককে টেনে আবার তার আগের জায়গায় নামিয়ে আনে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মস্তিষ্কের পেছনের দিকে সরে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সেটি কিন্তু সহজে ঠিক হতে চায় না। এর পেছনের কারণটাও বেশ মজার। পৃথিবীর অভিকর্ষ বল আমাদের ওপর থেকে নিচের দিকে টানে, কিন্তু পেছন থেকে সামনের দিকে টানে না। ফলে, মস্তিষ্কের পেছনের দিকের এই বিচ্যুতি সারিয়ে তুলতে শরীরের অনেক বেশি সময় লেগে যায়।
ভবিষ্যতের ডাক: মঙ্গলের পথে মানবজাতি
এই পুরো গবেষণাটি কেবল গবেষণাগারের নীরস কোনো রিপোর্ট নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যতের এক সতর্কবার্তা।
সামনের দিনগুলোতে মানুষ আর কেবল পৃথিবীর কক্ষপথে আটকে থাকবে না। মহাকাশ পর্যটন এখন আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনী নয়। তাছাড়া ইলন মাস্ক বা নাসার মতো সংস্থাগুলো মানুষকে মঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা হবে বছরের পর বছরব্যাপী এক দীর্ঘ অভিযান।
সেই দীর্ঘ ও অসীম শূন্যতায় মানুষের শরীর, বিশেষ করে আমাদের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ ‘মস্তিষ্ক’ কীভাবে আচরণ করবে, তা আগে থেকে জানা না থাকলে এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে মানবজাতি। তাই, মস্তিষ্কের এই ২ মিলিমিটার বিচ্যুতির জ্যামিতি বোঝা আজ কেবল বিজ্ঞানের শখ নয়, বরং মহাকাশে মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অপরিহার্য চাবিকাঠি।
