Sunday, March 1, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশমানুষহীন পৃথিবী: আমাদের ছাড়া কেমন হবে এই গ্রহ?

মানুষহীন পৃথিবী: আমাদের ছাড়া কেমন হবে এই গ্রহ?

দি ওয়ার্ল্ড উইদাউট আস: এক বিস্ময়কর ভাবনা

মনুষ্যবিহীন পৃথিবী নিয়ে আধুনিক জনপ্রিয় বিজ্ঞান আলোচনার সবচেয়ে প্রভাবশালী বইটির নাম, “দি ওয়ার্ল্ড উইদাউট আস”। বইটি লিখেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যালান ওয়েইজম্যান। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হবার পর বইটি নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার তালিকায় স্থান করে নেয়।

বইটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, আবার একেবারে নীরস একাডেমিক রিপোর্টও নয়। এটি লেখা হয়েছে প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, নিউক্লিয়ার সেফটি বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জীববিজ্ঞানীদের বাস্তব গবেষণা ও বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে।

বইটির মূল প্রশ্নটি ছিল সহজ, কিন্তু অস্বস্তিকর—মানুষ যদি হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর কী হবে? বইটি দেখিয়েছে, প্রকৃতি আসলে কারো জন্য অপেক্ষা করে না; মানুষ থাকুক বা নাই থাকুক, পৃথিবী তার নিজের প্রাকৃতিক নিয়মেই চলতে থাকবে।

মানুষহীন পৃথিবীর প্রথম কয়েক দিন

এই ভাবনাটা মাথায় রেখে যদি আমরা পৃথিবীর দিকে তাকাই, তাহলে একটা অদ্ভুত বাস্তবতা ধরা পড়বে। আমরা নিজেদের গড়া সভ্যতা নিয়ে যতই গর্ব করি না কেন, আমাদের তৈরি সভ্যতা আসলে খুব ভঙ্গুর।

মানুষ হারিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক শহরগুলো অন্ধকারে ডুবে যাবে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থা, যেটা ছাড়া আমরা আধুনিক জীবন কল্পনাই করতে পারি না, সেটা দাঁড়িয়ে আছে মানুষের অবিরাম নিয়ন্ত্রণের উপর।

  • বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালাতে মানুষ লাগে।
  • কোথাও হয়তো কিছু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর কিছু স্বয়ংক্রিয় নবায়নযোগ্য শক্তি আরো কিছুদিন চলবে।
  • কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে সব থেমে যাবে। পৃথিবী আবার রাতের প্রকৃত অন্ধকার চিনবে।

শিল্প দুর্ঘটনা ও আগুনের রাজত্ব

বিদ্যুতের অভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কুলিং সিস্টেম বন্ধ হয়ে শুরু হবে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। তেল শোধনাগার, গ্যাস প্ল্যান্ট, রাসায়নিক শিল্প—এসব জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটবে। আগুন লাগবে, বিস্ফোরণ হবে।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, সেই আগুন নেভানোর জন্য তখন কেউ থাকবে না। পৃথিবীর অনেক জায়গায় শিল্পাঞ্চল ধীরে ধীরে আগুনে পুড়বে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রথমে নিরাপত্তা মোডে যাবে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সময় ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা না থাকলে ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। এর মানে হলো, মানুষের অনুপস্থিতিতে বড় বড় কল কারখানা কোন কাজে আসবে না—বরং ধীরে ধীরে প্রকৃতির কাছে হেরে যাবে।

ভূগর্ভস্থ জগত ও বন্যা

মানুষ হারিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ জগত পানিতে ডুবে যাবে। সাবওয়ে, টানেল, আন্ডারগ্রাউন্ড এলাকা—এসব জায়গা সবসময় পাম্পের সাহায্যে শুকনো রাখা হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে পাম্প বন্ধ হয়ে পানি ধীরে ধীরে ঢুকবে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই ভূগর্ভস্থ কাঠামো পানিতে ভরে যাবে। উপরে শহর দাঁড়িয়ে থাকবে ঠিকই, কিন্তু ভেতরটা হবে জলময়।

প্রকৃতির প্রত্যাবর্তন ও বন্যপ্রাণী

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হবে একটু ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে। প্রথমে অনেক পোষা প্রাণী টিকে থাকতে পারবে না। খামারের প্রাণীরা মুক্ত হয়ে বাইরে বের হবে, কিন্তু সবাই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে না।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য চিত্র দেখা যাবে। যেসব বন্য প্রাণী মানুষের কারণে হারিয়ে যাচ্ছিল, তারা আবার ফিরে আসবে।

  • বন শহরের ভেতরে ঢুকে পড়বে।
  • নদী তার পুরোনো প্রবাহ ফিরে পাবে।
  • বাতাস ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে।

পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে মানুষের চিহ্ন মুছে ফেলবে। কোন রাগ থেকে নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।

শহরের মৃত্যু ও ধ্বংসাবশেষ

শহরের মৃত্যু হবে খুব ধীরে। কয়েক দশকের মধ্যে রাস্তার ফাটলে ঘাস জন্মাবে। ফুটপাথ ভেঙে গাছের শিকড় বের হবে।

  • এক শতাব্দীর মধ্যে কাঠের ঘরবাড়ি হারিয়ে যাবে।
  • কয়েক শতাব্দীর মধ্যে কংক্রিট দুর্বল হয়ে যাবে, ইস্পাত মরচে ধরে ভেঙে পড়বে।
  • ব্রিজ, টাওয়ার, বড় বড় সব স্থাপনা একসময় মাটিতে মিশে যাবে।

নদী নিজের পথ বানাবে, শুষ্ক এলাকায় মরুভূমি শহর গিলে ফেলবে, নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন জলপথ তৈরি হবে। প্রকৃতি কখনো তাড়াহুড়ো করে না, কিন্তু সে কখনো থেমেও থাকে না।

শেষ চিহ্ন ও মহাকালের সাক্ষী

হাজার হাজার বছর পরে হয়তো আজকের শহরগুলো শুধু ভূগর্ভস্থ স্তরে ইতিহাস হয়ে থাকবে। যেভাবে অনেক প্রাচীন সভ্যতা হারিয়ে গেছে।‌ উপরে থাকবে জঙ্গল, নদী আর নতুন প্রাণের জগৎ।

খুব বড় পাথরের কিছু স্থাপনা, যেমন মিশরের পিরামিড অথবা চীনের প্রাচীর হয়তো দীর্ঘ সময় টিকে থাকবে। কিন্তু যদি সময় লাখ লাখ বছর পেরিয়ে যায়, তখন হয়তো মানুষের অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন হবে শুধু মাটির স্তরে আটকে থাকা কিছু রাসায়নিক চিহ্ন অথবা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা।

উপসংহার: আমাদের শিক্ষার জায়গা

এই পুরো গল্পটা ভয় পাওয়ার কোন গল্প নয়। এটা আসলে এক ধরনের বিনয় শেখানোর গল্প। আমরা পৃথিবীর মালিক নই। আমরা এই পৃথিবীর বিশাল ইতিহাসের এক ক্ষণিক অধ্যায় মাত্র।

আমরা আসার আগে পৃথিবী ছিল। আমরা চলে গেলেও পৃথিবী থাকবে। কিন্তু আমাদের হাতে একটা জিনিস আছে, সেটা হলো পৃথিবীর পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা। এই ক্ষমতাটা আমরা আজ কীভাবে ব্যবহার করছি তার উপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে আমাদের টিকে থাকার প্রশ্ন। আর হয়তো এই বোধটাই মানবজাতিকে সত্যিকার অর্থে “বুদ্ধিমান প্রজাতি” বানাতে পারে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular