Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানমানব মাইক্রোবায়োম: শরীরের অদেখা অণুজীব ও স্বাস্থ্য

মানব মাইক্রোবায়োম: শরীরের অদেখা অণুজীব ও স্বাস্থ্য

শরীরের অদেখা সাম্রাজ্য

মানুষের শরীরকে আমরা সাধারণত একক সত্তা হিসেবে ভাবি। অথচ এর ভেতরে রয়েছে এক অদ্ভুত সহাবস্থান। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি অণুজীবের বিশাল সাম্রাজ্য, এক কথায় যাকে বলা হয়, মানব মাইক্রোবায়োম

এদের কেউ থাকে চামড়ায়, কেউ মুখে বা শ্বাসনালীতে, কেউ আবার প্রজননতন্ত্রে। কিন্তু এসব ব্যাকটেরিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশ রয়েছে মানুষের অন্ত্রে। এদেরকে বলে, গাট (gut) ব্যাক্টেরিয়া। এরা প্রতিদিন নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে:

  • আমাদের খাবারের আঁশ ভেঙে শক্তি জোগাচ্ছে।
  • ভিটামিন বি আর ভিটামিন কে তৈরি করছে।
  • আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় রাখছে।

আমরা যাকে নিজের দেহ বলি, সেটা আসলে এই অদৃশ্য সঙ্গীদের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য অংশীদারিত্ব।

সংখ্যায় মানুষ বনাম অণুজীব

একসময় ধারণা ছিল আমাদের শরীরে মানবকোষের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাক্টেরিয়ার কোষ আছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে মানুষের শরীরে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন মানবকোষের পাশাপাশি আছে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ব্যাক্টেরিয়ার কোষ।

অর্থাৎ সংখ্যাটা কাছাকাছি হলেও কিছুটা এগিয়ে আছে ব্যাক্টেরিয়া। এই সত্য নতুন করে ভাবায়—আমরা যতটা মানুষ, তার চেয়ে কিছুটা বেশি অণুজীবের আবাসভূমি।

গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস: দ্বিতীয় মস্তিষ্ক

গাট ব্যাক্টেরিয়ার প্রভাব কিন্তু হজমেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে আছে এক অদৃশ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, যাকে বলা হয়, ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’।

গাট ব্যাক্টেরিয়া সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিক তৈরি করে, যেটা সরাসরি আমাদের মেজাজ, আবেগ আর ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই একে অনেকে মানুষের “দ্বিতীয় মস্তিষ্ক” বলেও আখ্যা দেন।

ভারসাম্যহীনতা ও রোগের ঝুঁকি

তবে এই সাম্রাজ্যের ভারসাম্য নষ্ট হলে সমস্যা শুরু হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাবার, মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি গাট ব্যাক্টেরিয়ার বৈচিত্র্য কমিয়ে দেয়। এর ফলে দেখা দেয় নানা জটিলতা:

  • স্থূলতা ও ডায়াবেটিস
  • এলার্জি ও অটোইমিউন রোগ
  • এমনকি বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যা

তাই আজকাল দই, কিমচি, আচার কিংবা প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু সত্যিকারের পুষ্টির উৎস হলো আঁশসমৃদ্ধ খাবার, কাঁচা ফল আর সবজি, যা একদিকে অণুজীবদের খাদ্য জোগায়, আর অন্যদিকে আমাদের শরীরকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানব মাইক্রোবায়োম এখন নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন সব ওষুধ তৈরি হয়েছে যেখানে নির্বাচিত ব্যাক্টেরিয়ার স্পোর ক্যাপসুল আকারে দেওয়া হয় সংক্রমণ ঠেকাতে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ক্যানসার ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতাও অনেকাংশে নির্ভর করছে গাট ব্যাক্টেরিয়ার ওপর।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো পার্সোনালাইজড মেডিসিনের ধারণা। একই রোগে আক্রান্ত দুইজন মানুষের শরীরে ব্যাক্টেরিয়ার টাইপ আলাদা হতে পারে। ফলে একই ওষুধ একজনের ক্ষেত্রে কাজ করে, অন্যজনের ক্ষেত্রে করে না। কিন্তু যদি মাইক্রোবায়োম পরীক্ষা করে আগেভাগেই জানা যায় কার শরীরে কেমন অণুজীব আছে, তাহলে তার জন্য আলাদা খাদ্যতালিকা, প্রোবায়োটিক কিংবা ওষুধ নির্ধারণ করা সম্ভব। এভাবেই ভবিষ্যতের চিকিৎসা পদ্ধতি একেবারে ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে।

উপসংহার

মানুষ এবং মাইক্রোবায়োম আসলে একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। মাইক্রোবায়োম ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আর আমাদের ছাড়া ওদের পক্ষেও বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

তবে আমাদের দেহ আর মন সুস্থ থাকবে কি না, তার বড় অংশ নির্ভর করছে এই অদৃশ্য সঙ্গীদের ভারসাম্যের ওপর। তাই বিজ্ঞান এখন স্পষ্টভাবে বলছে, নিজেকে সুস্থ রাখতে হলে আমাদের যত্ন নিতে হবে শুধু নিজের নয়, ভেতরে থাকা এই নীরব সহযাত্রীদেরও।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular