Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeকোয়ান্টাম বিজ্ঞানভ্যান গগের স্টারি নাইট: ছবির আড়ালে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান

ভ্যান গগের স্টারি নাইট: ছবির আড়ালে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান

শিল্পের ক্যানভাসে বিজ্ঞানের ছায়া

ভিনসেন্ট ভ্যান গগের অমর সৃষ্টি ‘দ্য স্টারি নাইট’ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের চোখে বিস্ময় ছড়িয়ে আসছে। নীলাভ আকাশে ঢেউয়ের মতো তুলির আঁচড়, তারার চারপাশের ঘূর্ণি আর উজ্জ্বল অর্ধচন্দ্র; সব মিলিয়ে ছবিটি যেন এক স্বপ্নময় জগতের কথা বলে।

কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে এই ছবির আকাশময় ঘূর্ণিগুলো কেবল শিল্পীর কল্পনাই নয়, প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা আশ্চর্য এক বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।

কেলভিন–হেল্মহলৎজ ইনস্ট্যাবিলিটি

এর নাম কেলভিন–হেল্মহলৎজ ইনস্ট্যাবিলিটি বা সংক্ষেপে KHI। সাধারণত যখন দুটি ভিন্ন গতির তরল বা গ্যাস একসাথে মিলিত হয়, তাদের সংযোগস্থলে এক ধরনের ঢেউ তৈরি হয়। মেঘের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে যে ঢেউ দেখা যায়, কিংবা নদীর স্রোতের উপরিভাগে বাতাসের ধাক্কায় যে তরঙ্গ ওঠে, এ সবই KHI এর সহজ উদাহরণ।

তবে এতদিন প্রশ্ন ছিল, এমন ঘটনা যদি কোন কোয়ান্টাম তরলে ঘটে, যেখানে পদার্থ আলাদা কণার মতো না থেকে একসাথে তরঙ্গের মতো আচরণ করে, তাহলে কী হবে?

বোস–আইনস্টাইন কনডেনসেট ও কোয়ান্টাম পরীক্ষা

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যের উত্তর খুঁজলেন। তারা লিথিয়াম গ্যাসকে প্রায় শূন্য ডিগ্রি কেলভিন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তৈরি করলেন, বোস–আইনস্টাইন কনডেনসেট (BEC)।

এই অবস্থায় গ্যাসের পরমাণুগুলো অদ্ভুত আচরণ শুরু করে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী, বস্তুকণারা শুধুমাত্র কণাই নয়, একই সাথে তারা তরঙ্গও বটে। তাপমাত্রা যখন পরম শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন বস্তুকণার তরঙ্গধর্ম প্রকট হয়ে ওঠে। ন্যানো কেলভিন তাপমাত্রায় অসংখ্য কণা একসাথে মিলে গিয়ে একক তরঙ্গের মতো আচরণ শুরু করে। পুরো বস্তু তখন একক পরমাণুর মতো হয়ে ওঠে।

এটিই হলো পদার্থের পঞ্চম রূপ, বোস–আইনস্টাইন কনডেনসেট। যার তাত্ত্বিক ধারণা এক শতাব্দী আগে বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও আলবার্ট আইনস্টাইন যৌথভাবে দিয়েছিলেন। এই অবস্থায় অগণিত পরমাণু একসাথে একই ছন্দে নাচতে থাকে।

ল্যাবে স্টারি নাইটের ঘূর্ণি

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা তাদের পরীক্ষাগারে দু’টো ভিন্ন গতির BEC তৈরি করে মুখোমুখি করলেন। এর ফলে প্রথমে দেখা দিল ছোট ছোট ঢেউ, তারপর জন্ম নিল অদ্ভুত সব ঘূর্ণি।

এই ঘূর্ণিগুলোকে নাম দেওয়া হলো, এক্সসেন্ট্রিক ফ্র্যাকশনাল স্কাইর্মিয়ন। এই ঘূর্ণিগুলো দেখতে অনেকটা অর্ধচন্দ্রের মতো। ভেতরে থাকে ভাঙা ভাঙা বিন্যাস। এগুলো তরলের স্বাভাবিক গঠন ভেঙে দিয়ে কেলভিন–হেল্মহলৎজ অস্থিরতার মত নতুন এক ধরনের গঠন সৃষ্টি করে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই ঘূর্ণিগুলো সম্পূর্ণ চার্জ নয়, বরং অর্ধেক চার্জ বহন করে, যেটা প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত নিয়মের বাইরে।

আরো মজার বিষয় হলো, গবেষকরা বলছেন, ভ্যান গগের স্টারি নাইট ছবিতে যে ঘূর্ণি আঁকা আছে, সেটি দেখতে অবিকল এই ঘূর্ণিগুলোর মতো। যেন শিল্পীর তুলির আঁচড় আর ল্যাবরেটরির পরমাণুর খেলা একই সুরে বাঁধা পড়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও স্পিনট্রনিক্স

শিল্প ও বিজ্ঞানের এই অদ্ভুত মিল শুধু কল্পনার জন্মই দেয় না, বরং প্রযুক্তির ভবিষ্যতের পথও দেখায়। স্কাইর্মিয়ন নিয়ে আজকাল গবেষণা চলছে স্পিনট্রনিক্সের জগতে। যেখানে ইলেকট্রনের স্পিন ব্যবহার করে দ্রুত ও শক্তি সাশ্রয়ী কম্পিউটার তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। ভ্যান গগের ছবির আদলে জন্ম নেওয়া অদ্ভুত এই স্কাইর্মিয়ন একদিন হয়তো কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

উপসংহার

কালজয়ী শিল্পী ভ্যান গগ একশ বছর আগে তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে রাতের আকাশের সৌন্দর্য ক্যানভাসে এঁকেছিলেন। সেই সৌন্দর্য আজ বিজ্ঞানের পরীক্ষাগারে দেখা যাচ্ছে এক নতুন রূপে।

শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি আর বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ মিলেমিশে প্রমাণ করছে প্রকৃতিকে বোঝার সব পথই আসলে একে অপরের সাথে যুক্ত। আকাশের তারাদের ঘূর্ণি আর পরমাণুর অদৃশ্য কম্পন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ব-প্রকৃতির রহস্য ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular