Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাবিশ্বের মহাবিস্ময়মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: কোয়াসার

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়: কোয়াসার

ষাটের দশকের শুরুতে ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন বল্টন মহাকাশে দুটো অত্যন্ত শক্তিশালী রেডিও উৎসের সন্ধান পেয়েছিলেন।‌ এগুলোকে রেডিও টেলিস্কোপে শনাক্ত করা গেলেও, অপটিক্যাল টেলিস্কোপে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এদের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। এসব বিস্ময়কর মহাজাগতিক বস্তুর নাম দেওয়া হলো কোয়াসি স্টেলার রেডিও সোর্স (Quasi Stellar Radio Source), বা সংক্ষেপে কোয়াসার

পরবর্তী দুই দশকে এরকম আরো বেশ কিছু কোয়াসার শনাক্ত করা সম্ভব হলেও, এসব রহস্যময় রেডিও তরঙ্গের উৎস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।

কোয়াসারের দূরত্ব ও পর্যবেক্ষণ

নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, এসব মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান পৃথিবী থেকে কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। এই অচিন্তনীয় বিশাল দূরত্বের জন্য কোয়াসারগুলোকে রেডিও টেলিস্কোপে শনাক্ত করা গেলেও,‌ অপটিকাল টেলিস্কোপে এদের দেখা যাচ্ছিল না।

তবে পরবর্তীতে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ‌ ব্যবহার করে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং পদ্ধতিতে কোয়াসারের বেশ কিছু ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে।

মহাবিশ্বের আদি লগ্নে কোয়াসার

রেডিও টেলিস্কোপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী যে কোয়াসার-এর সন্ধান পাওয়া গেছে, তা পৃথিবী থেকে ১৩.০৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বের বয়স যখন ছিল মাত্র ৭৭০ মিলিয়ন বছর, ঠিক তখনই এদের অস্তিত্ব ছিল।

সহজ কথায়, কোয়াসারের দেখা পাওয়া গেছে মহাবিশ্বের একেবারে আদি লগ্নে। মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে গ্যালাক্সিগুলো যখন সবেমাত্র গঠিত হচ্ছিল, তখনই কোয়াসারগুলোর উদ্ভব হয়েছিলো। মহাবিশ্ব তখন ছিল খুবই অশান্ত। প্রকৃতপক্ষে, রেডিও বিকিরণের দিক থেকে কোয়াসার মহাবিশ্বের উজ্জ্বলতম বস্তু। এদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে বেশ কিছু নবীন গ্যালাক্সির কেন্দ্রে।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল ও কোয়াসার সৃষ্টি

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোয়াসার সৃষ্টির ক্ষেত্রে আদি মহাবিশ্বের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। নবগঠিত গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত এসব দানব আকৃতির ব্ল্যাকহোলের ভর সূর্যের চেয়ে কয়েকশো মিলিয়ন থেকে কয়েক বিলিয়ন গুণ বেশি হয়ে থাকে।

কোয়াসার সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ:

  • এসব দানবীয় ব্ল্যাকহোল তার চারপাশের হাইড্রোজেন গ্যাস এবং অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুকণাকে গ্রাস করে নেয়।
  • এর ফলে ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে উত্তপ্ত প্লাজমার একটি পরিবৃদ্ধি চক্র বা অ্যাক্রিশন ডিস্ক (accretion disk) সৃষ্টি হয়।
  • আমরা জানি, প্রবল মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো ধরনের বিকিরণ বের হতে পারে না, তাই ব্ল্যাকহোল অন্ধকারে ঢাকা থাকে।
  • কিন্তু ব্ল্যাকহোলের চারপাশের পরিবৃদ্ধি চক্রে অবস্থিত বস্তুকণা (বিশেষত ইলেকট্রন) ব্ল্যাকহোলে বিলীন হবার ঠিক আগে প্রবল মহাকর্ষের প্রভাবে অতি উজ্জ্বল এবং তীব্র বিকিরণের সৃষ্টি করে।

এই বিকিরণ রেডিও তরঙ্গ এবং এক্স-রে আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক বিলিয়ন বছর পর এই অতি উজ্জ্বল বিকিরণই কোয়াসার হিসেবে পৃথিবীর রেডিও দূরবীনে এসে ধরা পড়ে।

মূলত কোয়াসার হলো মহাবিশ্বের প্রাথমিক যুগের অবস্থা, যখন মহাবিশ্ব বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি অশান্ত ছিল। রেডিও টেলিস্কোপে এ পর্যন্ত প্রায় হাজার দুয়েক কোয়াসারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোকে পরীক্ষা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারছেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular