কোয়ান্টাম জাদু ও বাস্তবতা
কোয়ান্টাম জগতের খবরগুলো অনেক সময় এমন শোনায় যেন কোনো জাদুর কাহিনী বলা হচ্ছে। কিন্তু এই জাদু আসলে বাস্তব, একদম পরীক্ষাগারে ঘটছে। সম্প্রতি জাপানের কিয়োটো এবং হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল পদার্থবিজ্ঞানী এমনই এক “কোয়ান্টাম জাদু” করে দেখিয়েছেন, যা আগে কখনও কেউ করতে পারেনি।
তাঁরা এই প্রথমবারের মতো কোয়ান্টাম W-state নামের এক বিশেষ ধরণের কোয়ান্টাম এনট্যাংগলমেন্ট বা জড়িত অবস্থা মাপতে পেরেছেন। তাঁরা এটা করেছেন একবারে, সম্পূর্ণ সিস্টেমটিকে একসাথে মেপে! কোয়ান্টাম গবেষণার পরিভাষায় একে বলে, “এনট্যাংগল্ড মেজারমেন্ট”; আর এই সাফল্যের অর্থ হলো, কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞানের এক বিশাল দরজা একটু খুলে যাওয়া।
এনট্যাংগলমেন্ট ও ‘ভূতুড়ে কান্ড’
কোয়ান্টাম জগতের বস্তুকণাগুলো, যেমন ধরুন আলোর কণা ফোটন, অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে থাকে – একটির অবস্থা মাপলেই অন্যটির অবস্থা মুহূর্তের মধ্যেই জানা যায়। এমনকি কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে থাকলেও তারা পরস্পরের সাথে এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে থাকে।
আইনস্টাইন একে বলেছিলেন “spooky action at a distance” অর্থাৎ দূর থেকে ভূতুড়ে কান্ড। বস্তুকণাদের মধ্যে এই রহস্যময় সংযোগকেই বিজ্ঞানীরা বলেন, কোয়ান্টাম এনট্যাংগলমেন্ট। আর এটিই কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম যোগাযোগ ব্যবস্থা, এমনকি কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের ভিত্তি।
GHZ স্টেট বনাম W-state
এমন জড়িত অবস্থার নানা রূপ রয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত দুটি হলো GHZ state আর W-state।
- GHZ স্টেট: এই অবস্থায় একবার কোনো কণার মাপ নিলেই পুরো সিস্টেমের ঐক্য ভেঙে যায়; মানে একটির পরিমাপ নিলেই বাকি সব কণা স্বাধীন হয়ে যায়।
- W-state: কিন্তু W-state অনেক বেশি “সহনশীল”; এই অবস্থায় একটি কণা মেপে ফেললেও বাকি কণাদের মধ্যে জড়িত থাকা কিছুটা টিকে থাকে। তাই W-state হচ্ছে এক ধরণের টেকসই কোয়ান্টাম বন্ধন; যে জালের এক প্রান্ত ছিঁড়লেও বাকিটা অক্ষত থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন এই কোয়ান্টাম W-state কে একবারে পরিমাপ করতে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত সেটি অসম্ভবই মনে করা হতো। কারণ এই অবস্থায় তিন বা তার চেয়েও বেশি ফোটনকে একসাথে জড়িয়ে রাখতে হয়। আর তাদের সবাইকে একযোগে মাপা ছিল এক অসাধ্য কাজ।
জাপানি বিজ্ঞানীদের অসাধ্য সাধন
কিন্তু এবার জাপানি গবেষকেরা সেই অসাধ্য সাধন করে দেখালেন। তাঁরা তিনটি ফোটন নিয়ে তৈরি করলেন একটি W-state, তারপর বিশেষ এক ধরনের অপটিক্যাল সার্কিটের মাধ্যমে সেটিকে এমনভাবে পাঠালেন, যাতে তিনটি কণাই একসঙ্গে “জড়িতভাবে” পরিমাপ করা যায়। অর্থাৎ, পুরো অবস্থাটিকে একবারেই জানা সম্ভব হলো একটি সমন্বিত এনট্যাংগল্ড মেজারমেন্টের মাধ্যমে।
এই সাফল্যটিকে শুধু একটি পরীক্ষাগারের অর্জন বলা ঠিক হবে না। কারণ এর মধ্য দিয়ে এমন এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে গেছে, যেখান থেকে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন বা কোয়ান্টাম নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যাবে।
ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম যোগাযোগ
আমরা আজ যেভাবে তথ্য আদানপ্রদান করি, সেটা তখন সম্পূর্ণ বদলে যাবে। একদিন হয়তো তার জায়গা নেবে আলোর কণা – ফোটন। এই ফোটনগুলোর জড়িত অবস্থা, অর্থাৎ এনট্যাংগলমেন্টের জাল বুনে তৈরি হবে যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা। যেখানে বার্তা পৌঁছে যাবে মুহূর্তের মধ্যেই, দূরত্ব যতই বিশাল হোক না কেন।
এই কাজটিকে আরও বড় পরিসরে প্রয়োগ করা এখন পরবর্তী লক্ষ্য। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা চাইছেন, এই W-state পরিমাপ প্রযুক্তিকে বহু কণার সিস্টেমে সম্প্রসারিত করতে, যাতে একদিন এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
উপসংহার: আইনস্টাইনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা
একশো বছর আগে আইনস্টাইন, বোর আর শ্রোডিঙার যে “কোয়ান্টাম রহস্যের” কথা বলেছিলেন, আজ তা পরীক্ষাগারে মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসছে।
একেকটি ফোটন, একেকটি ক্ষুদ্র আলোর কণা, আজ মহাবিশ্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম সত্যগুলো উন্মোচন করছে। জাপানি গবেষকদের এই নতুন আবিষ্কার সেই যাত্রারই পরবর্তী পদক্ষেপ, যেখানে বিজ্ঞান আর বিস্ময় একাকার হয়ে যায়।
