২০২৫ সালকে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’র আন্তর্জাতিক বছর” হিসেবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে এক বৈপ্লবিক যাত্রার শতবর্ষ, যে যাত্রা বিজ্ঞানের ইতিহাসে বাস্তবতার ধারণা বদলে দিয়েছে।
আসলে এই গল্পের শুরু হয়েছে আরও আগে, বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ায়। যখন কিছু অদ্ভুত সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, প্রকৃতি আসলে সরল ও সোজাসাপ্টা নিয়মে চলে না, বরং তার ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে অনেক অজানা রহস্যের ভান্ডার।
কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম ও বিকাশ
এই যাত্রার সূচনা করেন জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। ১৯০০ সালে ব্ল্যাকবডি বিকিরণের রহস্য খুঁজতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, আলো বা শক্তি ক্রমাগত প্রবাহিত হয় না, বরং ছোট ছোট প্যাকেটের আকারে নিঃসৃত হয়। এই প্যাকেট গুলোকেই তিনি নাম দিলেন “কোয়ান্টা”। সেখান থেকেই জন্ম নিল কোয়ান্টাম তত্ত্ব।
এরপর তরুণ আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে দেখালেন, আলো শুধু তরঙ্গ নয়, কণার মতোও আচরণ করে। তাঁর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলো আলোর কণা বা ফোটনের আঘাতে ধাতব পদার্থের ইলেকট্রন নির্গমনের ঘটনা, যাকে আমরা বলি ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট। এই আবিষ্কার তাঁকে নোবেল পুরস্কার এনে দিল, আর একই সঙ্গে প্রমাণ করল, কোয়ান্টাম তত্ত্ব কোনো কল্পনা নয়, বরং বাস্তবতার গভীর সত্য।
নীলস বোর ও কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা
তারপর এলেন ডেনিশ পদার্থবিদ নীলস বোর। ১৯১৩ সালে তিনি হাইড্রোজেন পরমাণুর এক অভিনব মডেল দাঁড় করালেন, যেখানে ইলেকট্রন ঘুরছে নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে, আর হঠাৎ করেই লাফিয়ে যাচ্ছে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে। এই বোর মডেল আমাদের পরমাণুর গঠন বোঝার প্রথম সঠিক কাঠামো দিলো।
আর কোপেনহেগেনে তাঁর নেতৃত্বেই তৈরি হলো আধুনিক কোয়ান্টাম তত্ত্বের এক শিক্ষাপিঠ, যেখানে পরবর্তীতে আইনস্টাইন-বোর বিতর্ক থেকে শুরু করে “পরিমাপের দর্শন”- এ সব কিছুর ভিত্তি গড়ে ওঠে। কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরিমাপের আগে কোয়ান্টাম কণা নির্দিষ্ট থাকে না, বরং অসংখ্য সম্ভাবনায় ছড়িয়ে থাকে। পরিমাপের ঘটনাই সেই সম্ভাবনা থেকে একটিকে বাস্তবে “ঘটিয়ে” তোলে।
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা ও শ্রোয়েডিঙ্গারের তরঙ্গ
কিন্তু সত্যিকারের বিস্ফোরণ ঘটল ১৯২৫ সালে। যখন তরুণ জার্মান পদার্থবিদ ভার্নার হাইজেনবার্গ উত্তর সাগরের হেলগোল্যান্ড দ্বীপে বসে পরমাণুর আচরণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন। তখনো তিনি জানতেন না, তাঁর হাতে জন্ম নিতে যাচ্ছে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের নতুন যুগ।
হাইজেনবার্গ উপলব্ধি করেছিলেন, আমরা ইলেকট্রনের কক্ষপথ চোখে দেখতে পাই না, তাই কল্পনা দিয়ে সেটা আঁকতে যাওয়ার কোনো মানে নেই। বরং যেটা পরিমাপ করা যায়, যেমন আলো নিঃসরণের ফ্রিকোয়েন্সি বা শক্তিস্তরের পরিবর্তন, সেগুলোকেই গাণিতিক সূত্রে বেঁধে ফেলতে হবে। এই যুক্তি থেকে তিনি তৈরি করলেন ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স, যেটা আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রথম ধাপ।
এরপর তিনি দাঁড় করলেন তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তার নীতি। তিনি দেখালেন, কোনো বস্তুকণার অবস্থান আর ভরবেগ কখনো একই সাথে নির্ভুলভাবে জানা যাবে না। প্রকৃতি যেন নিজেকে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার আবরণে ঢেকে রেখেছে।
প্রায় একই সময়ে অস্ট্রিয়ার এরভিন শ্রোয়েডিঙ্গার ভিন্ন পথে এগোলেন। তিনি ইলেকট্রনকে বিন্দু নয়, বরং তরঙ্গ হিসেবে কল্পনা করলেন। তাঁর “শ্রোয়েডিঙ্গার সমীকরণ” দেখালো, ইলেকট্রনের অবস্থান আসলে এক তরঙ্গফাংশনে ছড়িয়ে থাকে, যেখানে সম্ভাবনার ঢেউ ওঠানামা করে। পরে বোঝা গেল, হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স আর শ্রোয়েডিঙ্গারের ওয়েভ মেকানিক্স আসলে এক অভিন্ন তত্ত্বের দুই ভাষা।
অ্যান্টিম্যাটার ও আধুনিক বিজ্ঞান
এরপর এলেন এক ব্রিটিশ প্রতিভা পল ডিরাক। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেললেন। তাঁর সমীকরণ ভবিষ্যদ্বাণী করল এমন এক অ্যান্টিম্যাটার কণার, যাকে আগে কেউ দেখেনি। এর নাম পজিট্রন, অর্থাৎ পজিটিভ ইলেকট্রন।
আশ্চর্যজনকভাবে কয়েক বছর পর সেটি সত্যিই আবিষ্কৃত হলো, এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রথমবার প্রমাণ করলো মহাবিশ্বের অদেখা দিকগুলোও আগেভাগেই অনুমান করা সম্ভব। এভাবে প্ল্যাঙ্কের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোয়ান্টা থেকে শুরু করে আইনস্টাইনের ফোটন, বোরের পরমাণুর মডেল, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র, শ্রোয়েডিঙ্গারের তরঙ্গফাংশন আর ডিরাকের অ্যান্টিম্যাটার—সব মিলিয়ে গড়ে উঠলো আধুনিক বিজ্ঞানের মেরুদণ্ড।
দৈনন্দিন জীবনে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির প্রভাব
এরপর শুরু হলো দৈনন্দিন জীবনে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি’র বিস্ময়কর প্রয়োগ। আজকের আধুনিক সভ্যতার অনেক কিছুই দাঁড়িয়ে আছে এই বিজ্ঞানের ওপর:
- মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার চিপ
- ট্রানজিস্টর ও সেমিকন্ডাক্টর
- লেজার ও ফাইবার অপটিক্স
- চিকিৎসার এমআরআই (MRI)
এমনকি রাসায়নিক বন্ধন বোঝা থেকে শুরু করে সুপারকন্ডাক্টর, ফটোভোল্টাইক সেল থেকে পারমাণবিক ঘড়ি—মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর ভিত্তি করে। আর আগামী দিনের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি—কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি, সেই যাত্রারই পরবর্তী অধ্যায়।
আগামীর সম্ভাবনা
২০২৫ সালের এই আন্তর্জাতিক বছর শুধু অতীতের উদযাপন নয়, বরং ভবিষ্যতেরও এক প্রতিশ্রুতি। হয়তো আগামী শতাব্দীতে কোয়ান্টামের হাত ধরেই মহাকর্ষের রহস্য ভেদ হবে, কিংবা ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জির মতো মহাবিশ্বের অদেখা বাস্তবতা উন্মোচন হবে।
কোয়ান্টাম বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, প্রকৃতি শুধু নিশ্চিত সূত্রের খেলা নয় বরং অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনার অসীম স্রোতে ভেসে চলা এক মহাবিস্ময়। শতবর্ষ পেরিয়ে সেই মহাবিস্ময় আজ শুধু বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়, একই সাথে মানব সভ্যতারও প্রাণশক্তি।
