দৃশ্যমান জগত বনাম কোয়ান্টাম জগত
আমরা সাদা চোখে যেভাবে পৃথিবীকে দেখি, তাতে মনে হয় বাস্তবতা মানেই আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান বস্তুজগৎ। টেবিল, চেয়ার, গাছ, পাথর, মানুষ—সবই যেন হাতে ছোঁয়া, চোখে দেখা জিনিস। আমাদের বিশ্বাস, এই বস্তুগুলোই সত্য; এদের গঠন, অবস্থান আর আকারেই গড়ে উঠেছে আমাদের চারপাশের বাস্তবতা।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে সম্পূর্ণ এক নতুন দিগন্ত। সেখানে দেখা যায়—বাস্তবতার মূল ভিত্তি বস্তু নয়; বরং আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর, আরও অদৃশ্য কিছু।
আমরা জানি, কোয়ান্টাম জগতে বস্তুকণা কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে, আবার কখনো কণিকার মতো। কোনো বস্তুকণার অবস্থান ও ভরবেগ—দুটোই একসঙ্গে নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আমরা কেবল বলতে পারি, কোথায় তার উপস্থিতির সম্ভাবনা বেশি। অর্থাৎ, বাস্তবতার গভীরে এমন কিছুই নেই যা একেবারে স্থির বা নির্ধারিত; জগতে সবকিছুই অনিশ্চিত এবং সম্ভাবনাময়।
প্রফেসর ডেনিস ডাইকস ও সম্ভাবনার তত্ত্ব
বাস্তবতার সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন নেদারল্যান্ডসের উট্র্যাখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শনের প্রফেসর এমেরিটাস ডেনিস ডাইকস। স্থান-কালের দর্শন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মোডাল ব্যাখ্যার জন্য তিনি সুপরিচিত।
তাঁর মতে, আমরা আমাদের চারপাশে যেসব বস্তু দেখি, তাদের “আলাদা অস্তিত্ব” বলে কিছু নেই। বস্তু কোনো স্থায়ী বা অনড় জিনিস নয়; বরং চলমান এক সম্ভাবনার ছায়া।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের উপমা
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করুন, আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০০ টাকা আছে। কিন্তু সেই টাকাটা আপনি কোথায় দেখছেন? ব্যাংকের স্টেটমেন্টে কেবল একটি সংখ্যা বা একখণ্ড তথ্য হিসেবে। সেটাকে না ছুঁয়েও আপনি জানেন টাকা আছে। আর ঠিক তখনই সেটা বাস্তব হয়ে ওঠে, যখন আপনি সেটাকে ব্যবহার করেন বা ট্রানজ্যাকশন করেন।
প্রফেসর ডেনিস ডাইকস বলছেন, আমাদের চারপাশের বস্তুগুলোর অবস্থাও অনেকটা তেমনই। তারা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় স্থির নেই; বরং তারা এক সম্ভাবনার জোয়ারে ভাসছে—যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা তাদের দিকে তাকাই, স্পর্শ করি অথবা সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের এই দেখাই যেন তাদের বাস্তবে রূপ দেয়।
এই দার্শনিক চিন্তা আমাদের চেনা জগতকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। আমরা যাকে বলি “বস্তু”, সেটা আসলে এক সূক্ষ্ম তরঙ্গের খেলা—যেখানে আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের চিন্তা ও চেতনা বাস্তবতার স্বরূপ নির্ধারণ করে।
সম্পর্ক ও সম্ভাবনার বুনন
প্রফেসর ডাইকসের মতে, বাস্তবতা বস্তু দিয়ে গঠিত নয়, বরং সম্পর্ক ও সম্ভাবনার বুননে তৈরি। প্রতিটি কণিকা, প্রতিটি বিন্দু তরঙ্গের আকারে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কোয়ান্টাম জগতে কেউ একা নয়, কেউ আলাদা নয়। ফলে আমাদের চোখে যা কিছু আলাদা বস্তু বলে মনে হয়, তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক নিরন্তর নৃত্য, এক অখণ্ড জাল, যেখানে সবই একে অপরের প্রতিধ্বনি।
আকাশে এক টুকরো মেঘ দেখে আপনি ভাবলেন—“ওটা মেঘ।” কিন্তু আসলে মেঘ কি কোনো স্থায়ী জিনিস? প্রতি মুহূর্তে তার জলীয় কণাগুলো বদলে যাচ্ছে, সরে যাচ্ছে, বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা সেই পরিবর্তনশীল প্রবাহকে একটি স্থির ছবি হিসেবে দেখি। বাস্তবতাও ঠিক তেমনই—প্রতিনিয়ত চলমান, পরিবর্তনশীল এবং সর্বোপরি অনির্ধারিত। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক তাকে স্থির বস্তু হিসেবে ধরে নেয়, যেন বাস্তবতা নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া সহজ হয়।
সত্য ও দর্শকের ভূমিকা
বস্তুজগত যখন এত অনিশ্চিত ও তরঙ্গিত, তখন প্রশ্ন জাগে তাহলে সত্য আসলে কী? প্রফেসর ডাইকস বলছেন, সত্য কোনো কঠিন পাথরের মতো ধ্রুব নয়। সত্যও তরল, পরিবর্তনশীল এবং সম্পর্ক-নির্ভর। আমরা যেভাবে দেখি, বাস্তবতা সেই রূপই ধারণ করে। অর্থাৎ, আমরা কেবল দর্শক নই; আমরা বাস্তবতার সহ-নির্মাতা।
এই চিন্তা আমাদের অন্যভাবে ভাবতে শেখায়। আমরা যা দেখি, সেটাই হয়তো চূড়ান্ত নয়; আবার যা দেখি না, তাও হয়তো গভীরভাবে বিদ্যমান। বাস্তবতার অন্তরালে আছে এক অপার রহস্য—এক সম্ভাবনার নৃত্য, যেখানে “বস্তু” কেবল এক ক্ষণিকের ছায়া, আর সত্য উদ্ভাসিত হয় তরঙ্গের মতো। এটাই হয়তো বাস্তবতার প্রকৃত রূপ।
মহান সুফি সাধক জালাল উদ্দিন রুমি যেমন বলেছিলেন,
“তুমি যা দেখো, তা-ই সত্য নয়; সত্য লুকিয়ে থাকে তার আড়ালে।”
