সময়ের একমুখী স্রোত ও নতুন প্রশ্ন
সময়কে আমরা সাধারণত একমুখী স্রোতের মতো কল্পনা করি। যেখানে সবকিছুই ভবিষ্যতের দিকে এগোয়, অতীত কখনোই আর ফিরে আসে না। জন্ম, বয়স, মৃত্যু—সবই যেন সেই একমুখী পথের যাত্রী। কিন্তু বিজ্ঞান সবসময়ই আমাদের চমকে দিতে ভালোবাসে।
সম্প্রতি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী এমনই এক বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছেন, যেটা আমাদের সেই একমুখী সময়বোধকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তাঁরা এমন এক কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া খুঁজে পেয়েছেন, যেখানে মনে হচ্ছে, সময় যেন উল্টো দিকে হাঁটছে!
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা: ফোটনের ভেলকি
গবেষকরা তাঁদের পরীক্ষাগারে এমন একটি পরীক্ষা করেছেন যেখানে আলোর কণা বা ফোটন একটি জটিল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধরে নেই, কোনো বস্তুতে আলো প্রবেশ করলে সেখানে একটা প্রতিক্রিয়া হয়, তারপর সেখান থেকে আলো নির্গত হয়।
কিন্তু এই পরীক্ষায় দেখা গেছে এক অদ্ভুত কান্ড:
- ফোটন কণা যেন ঠিকঠাকভাবে প্রবেশ করার আগেই আবার বেরিয়ে যাচ্ছে।
- এক মুহূর্তে যেন সময়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
এ যেন আপনি দরজায় কড়া নাড়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে উত্তর এসে গেছে! এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন নেগেটিভ টাইম বা নেতিবাচক সময়।
আইবিএমের কোয়ান্টাম সিমুলেশন
শুধু এই পরীক্ষাই নয়, ২০২৪ সালে আইবিএমের (IBM) কোয়ান্টাম কম্পিউটারেও গবেষকরা কৃত্রিমভাবে একটি কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াকে আংশিকভাবে “পেছনের দিকে ঘুরিয়ে” দেখিয়েছেন। সেখানে দেখা গেছে, সময় হয়তো ঋজুভাবে প্রবাহিত নাও হতে পারে; বরং কখনো কখনো ভাঁজ হয়ে একই সঙ্গে দুই দিকেই ছড়াতে পারে!
আইনস্টাইন কি ভুল ছিলেন?
তবে এটা কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের বিরোধী কোনো ব্যাখ্যা নয়। এখানে কোনো কণাই আলোর চেয়ে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে না। এটা কোয়ান্টাম জগতের এক অদ্ভুত খেলা, যেখানে কণাগুলো একসাথে একাধিক সম্ভাবনার মাঝে ছুটে বেড়ায়।
তারা কখনোই ঠিক করে বলে না, তারা কোথায় ছিল বা কখন কী করেছিল। তার বদলে তারা বলে, “হয়তো এখানে ছিলাম, হয়তো ওখানে।” আর সময়টা? সেটা নিয়েও এখন কিছু বলা মুশকিল!
বিজ্ঞানীদের বিতর্ক ও সাবিন হোসেনফেল্ডার
এই বিষয়টি নিয়ে অবশ্য বিজ্ঞানী মহলে মতপার্থক্যও রয়েছে। জার্মান পদার্থবিদ সাবিন হোসেনফেল্ডার “নেগেটিভ টাইম” শব্দটির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে:
- এটি সময় উল্টে যাওয়ার কোনো প্রমাণ নয়।
- বরং এটি মাপজোকের এক ধরনের গাণিতিক পুনর্গঠন, যাকে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
কিন্তু টরন্টোসহ বিভিন্ন দলের গবেষকরা বলছেন, যে ব্যাখ্যাই হোক, ফলাফলটি বাস্তব, পরিমাপযোগ্য এবং ভীষণভাবে অস্বাভাবিক।
কার্যকারণ (Causality) ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি
আর এখানেই শুরু সেই বড় প্রশ্ন—যদি সময় সত্যিই ভাঁজ হতে পারে, তাহলে কি বর্তমানের কোনো ক্রিয়া অতীতেও প্রতিফলিত হতে পারে? অথবা আমাদের আজকের চিন্তা অথবা সিদ্ধান্ত কি সূক্ষ্মভাবে ভবিষ্যৎকেও বদলে দিতে পারে?
যদি তাই হয়, তাহলে কারণ-কার্য (cause-effect) সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাই নড়বড়ে হয়ে যায়। বাস্তবতার বুননই হয়তো এতটা নরম ও নমনীয়, যেটা আমরা আগে ভাবিইনি।
এই আবিষ্কার কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের নয়, বরং সচেতনতা, চেতনাবোধ এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে:
- কোয়ান্টাম কম্পিউটার
- টেলিপোর্টেশন প্রযুক্তি
এসব কিছুর ভাবনা নতুন করে সাজাতে হতে পারে।
উপসংহার
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার আমাদের মানসিক কাঠামোতে। কারণ সময় হয়তো শুধু একটা টিকটিক করা ঘড়ির পথ নয়। হয়তোবা এটা একটা খোলা দরজা, যেটা সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, এমনকি কোয়ান্টামের অদ্ভুত গলিঘুঁজির মধ্যেও একসঙ্গে চলতে পারে।
বিজ্ঞানের জগৎ তাই আবারও মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি উত্তরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নতুন প্রশ্নের জন্ম। আর সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে খুলে দেয় এক নতুন মহাবিশ্ব, যেখানে সময় আর আগের মত সোজা পথে হাঁটে না, বরং নীরবে কোথাও উল্টো পথেও যায়।
