Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাবিশ্বের মহাবিস্ময়কসমিক ইনফ্লেশন: মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ও বিগ ব্যাং

কসমিক ইনফ্লেশন: মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ও বিগ ব্যাং

মহাবিশ্বের সূচনা ও বিগ ব্যাং

মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। কীভাবে শুরু হলো এই অসীম মহাকাশ? কোথা থেকে এলো অসংখ্য তারার মেলা আর আমাদের এই চেনা পৃথিবী? বিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত উত্তর হলো ‘বিগ ব্যাং’। যেখান থেকে জন্ম নিয়েছে মহাবিশ্বের সবকিছু। এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে আধুনিক কসমোলজির ভিত্তি।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং দিয়ে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল। এর আগে মহাবিশ্বের সমস্ত শক্তি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল, যাকে বলা হয়, সিঙ্গুলারিটি। হঠাৎ করেই এই সিঙ্গুলারিটির ভেতরে শক্তির রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঘটে যায় এক মহাবিস্ফোরণ, যার ফলে মহাবিশ্বে স্থান-কাল আর বস্তুর উদ্ভব হয়েছে।

বিগ ব্যাং-এর সীমাবদ্ধতা ও নতুন ভাবনা

কিন্তু শিগগিরই বোঝা গেল, শুধু বিগ ব্যাং থিওরি দিয়ে মহাবিশ্বের সব রহস্য ব্যাখ্যা করা যায় না। বেশ কিছু প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে:

  • কেন মহাবিশ্ব এত সমানভাবে ছড়ানো?
  • কেনই বা এটি প্রায় পুরোপুরি সমতল?
  • মহাবিশ্বের একেবারে দুই বিপরীত প্রান্তের আলো কেন প্রায় একই বৈশিষ্ট্য বহন করে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জন্ম নিল এক অভাবনীয় ধারণা, যার নাম কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি।

অ্যালান গাথ ও কসমিক ইনফ্লেশন

১৯৮১ সালে মার্কিন পদার্থবিদ অ্যালান গাথ প্রথম এই তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরপরই, এক ক্ষুদ্র মুহূর্তে মহাবিশ্ব অবিশ্বাস্য দ্রুততায় প্রসারিত হয়েছিল। এক সেকেন্ডের অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে (10⁻³⁶ থেকে 10⁻³² সেকেন্ডে) মহাবিশ্ব কোটি কোটি গুণ বড় হয়ে যায়। এই বিস্ময়কর ঘটনাকেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন, কসমিক ইনফ্লেশন।

প্রসারণের নেপথ্যে: ইনফ্লাটন ফিল্ড

এই ইনফ্লেশনের পেছনে কাজ করেছিল বিশেষ এক ধরনের শক্তি, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ইনফ্লাটন ফিল্ড’ বলে থাকেন। এই ফিল্ডে জমে থাকা শক্তি ছিল বিকর্ষণধর্মী। আমরা জানি মহাকর্ষ সবকিছুকে কাছে টেনে নেয়, কিন্তু এই ইনফ্লাটন ফিল্ড মহাবিশ্বকে উল্টো দিকে ঠেলে প্রসারিত করেছিল।

সাধারণ আপেক্ষিকতার নিয়মে দেখা যায়, শক্তির ভিন্ন প্রকৃতিতে মহাকর্ষের আচরণ বদলাতে পারে। ইনফ্লাটন ফিল্ডের শক্তি ছিল সেই বিরল ধরণের, যেটা মহাকর্ষকে বিপরীতমুখী করে দিয়েছিল। সেই অদ্ভুত শক্তিই মহাবিশ্বকে অকল্পনীয় গতিতে স্ফীত করে তুলেছিল। সংক্ষেপে বলা যায়, কসমিক ইনফ্লেশন ছিল মহাকর্ষের এক অস্বাভাবিক বিকর্ষণধর্মী প্রকাশ, যেটা মহাবিশ্বকে এক পলকে বিপুলভাবে প্রসারিত করেছিল।

মহাজাগতিক রহস্যের সমাধান

কসমিক ইনফ্লেশন তত্ত্ব বেশ কিছু জটিল প্রশ্নের সরল সমাধান দেয়:

১. মহাবিশ্বের সমতা: মহাবিশ্বের দুই প্রান্তের আলো কেন একই রকম? কারণ এক সময় এরা পরস্পরের খুব কাছে ছিল, পরে ইনফ্লেশনের ফলে দূরে সরে গেছে। ২. সমতল মহাবিশ্ব: মহাবিশ্ব কেন এত সমতল? কারণ ইনফ্লেশন সব বাঁকানো অংশকে টেনে প্রায় সমান করে দিয়েছে। অর্থাৎ স্থানকাল ভেতরে বা বাইরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাঁকেনি, ফলে আলো সোজা পথে চলে। ৩. চৌম্বক মোনোপোল: প্রাথমিক মহাবিশ্বে চৌম্বক মোনোপোল কণার অস্তিত্ব থাকার কথা, অথচ আমরা দেখতে পাই না কেন? কারণ প্রচণ্ড প্রসারণে তাদের ঘনত্ব প্রায় শূন্যে নেমে গেছে।

কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন ও আমাদের অস্তিত্ব

কসমিক ইনফ্লেশনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন বা কোয়ান্টাম কম্পনের প্রসারণ। প্রথমে এগুলো ছিল অতিক্ষুদ্র, কিন্তু ইনফ্লেশনের কারণে সেটা মহাজাগতিক মাত্রায় পৌঁছে যায়।

ইনফ্লেশনের ফলে এই সূক্ষ্ম ওঠানামাগুলো মহাবিশ্বে ঘনত্বের সামান্য পার্থক্য তৈরি করে। সেই ঘন অংশগুলো মহাকর্ষের টানে জমাট বেঁধেই পরে নেবুলা, গ্যালাক্সি, নক্ষত্র আর গ্রহে রূপ নেয়। অর্থাৎ আমাদের পৃথিবী আর আমরা নিজেরাই লুকিয়ে আছি সেই আদিম কোয়ান্টাম অস্থিরতার বীজে।

বৈজ্ঞানিক প্রমাণ: সিএমবি (CMB)

এই ইনফ্লেশনের ধারণার পেছনে শক্ত প্রমাণও পাওয়া গেছে। মহাবিশ্বে ভেসে থাকা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) হলো বিগ ব্যাংয়ের পর জন্ম নেওয়া বিকিরণ। ষাটের দশকে দু’জন মার্কিন রেডিও ইঞ্জিনিয়ার, পেনজিয়াস ও উইলসন, হঠাৎ করেই তাঁদের স্থাপিত রেডিও এন্টেনায় এই অদ্ভুত বিকিরণের সন্ধান পেয়েছিলেন।

পরবর্তীতে প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট ও WMAP মিশনের পর্যবেক্ষণ দেখিয়েছে, CMB-তে যে সূক্ষ্ম তাপমাত্রার ভিন্নতা রয়েছে, সেটা একেবারেই মিলে যায় ইনফ্লেশনের তাত্ত্বিক হিসেবের সাথে।

ইনফ্লেশন ও মাল্টিভার্স ধারণা

তবে এখানেই শেষ নয়। কসমিক ইনফ্লেশনের গাণিতিক বিশ্লেষণ বলে, সব জায়গায় একসাথে ইনফ্লেশন থেমে যায়নি। অর্থাৎ ইনফ্লেশন কোথাও থামে আবার অন্য কোথাও চলতে থাকে। এভাবে বুদবুদের মত গড়ে উঠতে পারে অসংখ্য মহাবিশ্ব। যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাল্টিভার্স।

এসব অসংখ্য মহাবিশ্ব একে অপরের সমান্তরাল কিন্তু পরস্পর থেকে একেবারেই পৃথক। প্রতিটি মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়ম, ধ্রুবক, আর উপাদান আলাদা হতে পারে। কোথাও হয়তো নক্ষত্র সৃষ্টি হয়নি, আবার কোথাও হয়তো জীবনের অস্তিত্ব আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম ভাবে। মাল্টিভার্স ধারণার সরাসরি কোন প্রমাণ নেই। তবে এটিকে “শুধুই কল্পনা” বলে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এটাই কসমিক ইনফ্লেশনের যৌক্তিক পরিণতি। আর সেই কারণেই মাল্টিভার্স বিজ্ঞানীদের কাছে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় তত্ত্ব।

উপসংহার

সব মিলিয়ে কসমিক ইনফ্লেশন থিওরি আধুনিক কসমোলজির এক অসাধারণ অর্জন। এই তত্ত্ব জানিয়ে দেয়, আমাদের চেনা মহাবিশ্বের বর্তমান চেহারা কেন এমন আর একই সাথে অসংখ্য অচেনা মহাবিশ্বের অস্তিত্বের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দেয়। খুলে দেয় কল্পনার নতুন দুয়ার। আমরা হয়তো পুরো সত্য জানি না, কিন্তু ইনফ্লেশনের ধারণা আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে মহাবিশ্বের আরো গভীর রহস্যের দিকে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular