Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানস্পেসটাইম: চতুর্থ মাত্রা ও মিনকোভস্কির মহাবিশ্ব

স্পেসটাইম: চতুর্থ মাত্রা ও মিনকোভস্কির মহাবিশ্ব

বিজ্ঞানের যাত্রাপথ ও নতুন মাত্রা

বিজ্ঞানের ইতিহাস রোমাঞ্চকর এক যাত্রাপথ, যেখানে প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একসময় মানুষ ভাবত পৃথিবী সমতল, পরে জানা গেল সেটা গোল। মানুষ বিশ্বাস করত সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, পরে জানল আসলে পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে।

আবার বহু শতাব্দী ধরে মানুষ ভেবেছে আমাদের চারপাশের বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিনটি স্থানিক মাত্রার ওপর। এই তিন মাত্রাই যেন আমাদের অস্তিত্বের পরিপূর্ণ সীমানা। কিন্তু সেই ধারণা পাল্টে গেল একদল গণিতবিদ, সাহিত্যিক এবং পদার্থবিজ্ঞানীর কল্পনা ও যুক্তির আশ্চর্য সম্মিলনে। আর সেই বিপ্লবের কেন্দ্রে ছিল এক যুগান্তকারী ভাবনা—স্থানের মত সময়ও একটি মাত্রা। স্থান আর সময় একসাথে মিলে গড়ে তুলেছে স্পেসটাইম বা স্থান-কাল, চতুর্মাত্রিক এক বাস্তবতা।

চতুর্থ মাত্রার জন্ম ও ফ্ল্যাটল্যান্ড

এই চতুর্থ মাত্রার ধারণা হঠাৎ করেই জন্ম নেয়নি। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে গণিতবিদরা যখন ইউক্লিডীয় জ্যামিতির সীমা ছাড়িয়ে ভাবতে শুরু করলেন, তখনই এর বীজ রোপিত হয়। তাঁরা কল্পনা করলেন, যদি সরলরেখার বহু কপি মিলে একটি তল হয়, তলের বহু কপি মিলে একটি ঘনবস্তু হয়, তবে ঘনবস্তুর অসংখ্য কপি কি কোনো উচ্চতর, অদৃশ্য মাত্রার জন্ম দিতে পারে না? এই চিন্তাই জন্ম দিল বহুমাত্রিক “হাইপারস্পেস” ধারণার। তখনও সেটা ছিল নিছক কল্পনা, কিন্তু অযৌক্তিক ছিল না।

১৮৮৪ সালে এডউইন অ্যাবট এই ধারণাকে সাহিত্যের মঞ্চে আনেন। তাঁর বিখ্যাত বই ফ্ল্যাটল্যান্ড-এ তিনি গল্প বলেন এক দ্বিমাত্রিক জগতের প্রাণীদের নিয়ে, যাদের জগতে হঠাৎ প্রবেশ করে একটি ত্রিমাত্রিক গোলক। সেই গোলক তাদের বলে, “তোমাদের জগত ছাড়াও আরও এক উচ্চতর বাস্তবতা আছে, যেটা তোমরা কল্পনাও করতে পারো না।” এই গল্প পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগাল—আমরাও কি তবে কোনো অদৃশ্য উচ্চতর মাত্রার বেড়াজালে বন্দি, যার অস্তিত্ব আছে অথচ চোখে ধরা পড়ে না?

মিনকোভস্কি ও স্থান-কালের মিলন

এরপর দৃশ্যপটে এলেন হারম্যান মিনকোভস্কি। প্রতিভাবান জার্মান গণিতজ্ঞ মিনকোভস্কি ছিলেন জুরিখ পলিটেকনিকে আইনস্টাইনের সরাসরি শিক্ষক। আইনস্টাইন অবশ্য প্রায়ই তাঁর ক্লাসে ফাঁকি দিতেন, কিন্তু পরে মিনকোভস্কিই আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে শক্ত গাণিতিক কাঠামো দেন।

১৯০৮ সালে মিনকোভস্কি তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতায় (Raum und Zeit – “স্থান ও সময়”) বললেন, যদি আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা সত্যি হয়, তবে সময় আর স্থানকে আলাদা করে ভাবা যাবে না। তারা একসাথে মিলে তৈরি করে স্পেসটাইম, এক চতুর্মাত্রিক ক্ষেত্র। এই কাঠামোয়:

  • প্রতিটি ঘটনার একটি স্থানগত ও সময়গত অবস্থান থাকে, যাকে তিনি বললেন, ইভেন্ট
  • কোনো বস্তুর চলাচল এই স্পেসটাইমে যে রেখা তৈরি করে, সেটিই হলো ওয়ার্ল্ডলাইন

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি

এটি নিছক কোনো গাণিতিক খেলা নয়। এটাই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত। এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি:

  • সময় কীভাবে ধীর হয়।
  • বস্তুর গতি কীভাবে সময়ের প্রবাহকে কমিয়ে দেয়।
  • ভর কীভাবে স্পেসটাইমকে বাঁকিয়ে দেয়—যাকে আমরা অনুভব করি মহাকর্ষ বল হিসেবে।

আসলে ভারী বস্তু কোনো কিছুকে টানে না, বরং স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়, আর সেই বাঁকে পড়ে অন্য বস্তু তার চলার পথ পাল্টায়।

আলোক-শঙ্কু (Light Cone) ও বর্তমান

চতুর্মাত্রিক জগতের ধারণা সবচেয়ে সহজভাবে বোঝা যায় আলোক-শঙ্কু দিয়ে। মনে করুন, আপনি এখন একটি নির্দিষ্ট জায়গায়, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন। এখান থেকে আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, আর যত দূরে সেটা পৌঁছায়, তত সময় কেটে যাচ্ছে।

  • ভবিষ্যতের শঙ্কু: আলো ভবিষ্যতে যেখানে যেতে পারবে, সেটাই হলো ভবিষ্যতের আলোক-শঙ্কু।
  • অতীতের শঙ্কু: আবার মনে করুন, সূর্যের আলো, যা এখন আপনার চোখে পড়ছে, সেই আলো আসলে আট মিনিট বিশ সেকেন্ড আগে সূর্য থেকে রওনা হয়েছিল। অতীতের যেসব ঘটনা থেকে আলো এসে আপনার বর্তমান মুহূর্তে মিলেছে, তা গঠন করেছে অতীতের আলোক-শঙ্কু।

এই দুটি শঙ্কুর মিলন বিন্দুই আপনার বর্তমান সময়। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় কোন ঘটনার প্রভাব আপনি পেতে পারেন, আর কোনটি আপনার কাছে চিরকাল অগম্য থাকবে।

মহাবিশ্বের প্রসারণ ও স্ট্রিং থিওরি

মিনকোভস্কির স্পেস-টাইমের এই ধারণাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এর ফলেই ব্ল্যাকহোল, গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং, মহাবিশ্বের প্রসারণ, সময়ের বাঁক—এসব আজ নিছক কল্পনা নয়, বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার বিষয়।

তবে বিজ্ঞান থেমে নেই। চতুর্মাত্রার বাইরে আজ পদার্থবিজ্ঞানীরা ভাবছেন ১০ কিংবা ১১ মাত্রা নিয়ে। স্ট্রিং থিওরি বলছে, মহাবিশ্বের গভীর গঠন এতটাই সূক্ষ্ম যে অধিকাংশ মাত্রা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না, তারা ভাঁজ হয়ে আছে অতি ক্ষুদ্র স্কেলে। এই বহু-মাত্রার মধ্যে কোথাও হয়তো আছে ওয়ার্মহোল—দুই ভিন্ন স্পেসটাইম অঞ্চলকে জোড়া দেওয়া সেতু, যার ভেতর দিয়ে সময়ভ্রমণ অথবা আন্তঃগ্যালাকটিক অভিযাত্রা একদিন বাস্তব হতে পারে।

উপসংহার

চতুর্মাত্রিক জগত চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার ছাপ রয়েছে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে। যখন ঘড়ির কাঁটা এগোয়, যখন গতির ফলে সময় ধীরে চলে, কিংবা যখন কোনো তারা ব্ল্যাকহোলে মিলিয়ে যায়—এ সবই প্রমাণ করে আমরা আসলে এক চতুর্মাত্রিক নাট্যমঞ্চের চরিত্র।

মাত্র ৪৪ বছর বয়সে হারম্যান মিনকোভস্কির অকাল মৃত্যু হলেও তাঁর ভাবনা আজও চিরজীবী। সময়কে তিনি ক্যালেন্ডার বা ঘড়ির কাঁটার সীমা থেকে উদ্ধার করে এনে দাঁড় করিয়েছেন বাস্তবতার কেন্দ্রে। আর তাঁর এই সৃষ্টিশীল চিন্তা আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সবচেয়ে বড় সত্যগুলো চোখে দেখা যায় না; তারা ধরা দেয় কেবল কল্পনা, যুক্তি আর সৃজনশীল চিন্তার সম্মিলিত আলোকছটায়।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular