বস্তুর অতি ক্ষুদ্র জগত চলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর নিয়মে। ইলেকট্রন, ফোটন বা অন্য সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার গতি-প্রকৃতি, পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া আর শক্তি বিনিময়ের অদ্ভুত কিন্তু নির্ভুল হিসেব মেলে বিভিন্ন কোয়ান্টাম সমীকরণে।
এসব সমীকরণগুলোর সূক্ষ্মতা এতটাই বিস্ময়কর যে, এদের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক প্রযুক্তির অর্ধেকেরও বেশি দাঁড়িয়ে আছে। কম্পিউটার চিপ, সোলার প্যানেল, অপটিক লেজার, এমনকি হাসপাতালের এমআরআই স্ক্যানার—এ সবই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জাদু ছাড়া অকেজো হয়ে যেত।
ইউনেস্কোর ঘোষণা ও বিজ্ঞানীদের বিতর্ক
২০২৫ সালকে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে “কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বছর” হিসেবে। এর উদ্দেশ্য, শতবর্ষব্যাপী এই বৈপ্লবিক যাত্রাকে সম্মান জানানো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে যতই কার্যকর হোক না কেন, এই তত্ত্বের ‘বাস্তব অর্থ’ নিয়ে আজও বিজ্ঞানীরা একমত নন।
বিখ্যাত নেচার ম্যাগাজিনের সাম্প্রতিক এক জরিপে হাজারের বেশি পদার্থবিজ্ঞানীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—“কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশন আসলেই কি বাস্তব?” ফলাফল ছিল চমকপ্রদ:
-
৪৭% বললেন, এটা শুধু কার্যকরী গাণিতিক মডেল, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
-
৩৬% মনে করেন, এটা সত্যিই আছে, যদিও আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে উঠতে পারিনি।
-
বাকিদের মতে, এটি বাস্তবতা ও আমাদের ধারণার মিশ্রণ।
কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা ও ওয়েভ ফাংশন
এইসব বিতর্কের মাঝেই উঠে আসে “কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রেটেশন”, যেটা ডেনিশ পদার্থবিদ নিলস বোর-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা। এই মত অনুযায়ী, কোনো কণাকে পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত সেটি কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না, বরং একই সঙ্গে একাধিক সম্ভাব্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে।
এই একাধিক সম্ভাব্য অবস্থাকে বলে সুপার পজিশন। আর এই অবস্থাগুলোর সব তথ্যকে গাণিতিকভাবে বর্ণনা করে যে ফর্মুলা, সেটাই হলো ওয়েভ ফাংশন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সেটি পর্যবেক্ষণ করি না, ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়েভ ফাংশন খোলা সম্ভাবনার সমুদ্রের মতো ছড়িয়ে থাকে। আর ঠিক পর্যবেক্ষণের মুহূর্তেই এটি হঠাৎ একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় ‘ধ্বসে’ পড়ে, ওয়েভ ফাংশনের সমাপ্তি তখনই ঘটে।
এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট: দূর থেকে ভূতুড়ে কান্ড
কোয়ান্টাম জগতের আরও বিস্ময়কর ঘটনা হলো এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট বা পরস্পর জড়িয়ে থাকা। দুটি কণা একবার বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে গেলে, তারা যত দূরেই থাকুক না কেন, একটির অবস্থা পরিবর্তন হলে অন্যটির অবস্থাও সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়।
আইনস্টাইন একে মজা করে বলেছিলেন—“দূর থেকে ভূতুড়ে কান্ড” (Spooky action at a distance)। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বারবার পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে যে, ঘটনাটি সত্যিই ঘটে।
তবে এই সব ধারণা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না, তাই এর ব্যাখ্যা নিয়েও নানা ধরনের মতভেদ তৈরি হয়। কেউ আস্থা রাখেন কোপেনহেগেন ব্যাখ্যায়, কেউ আবার বিশ্বাস করেন বিকল্প ব্যাখ্যায়। যেমন, বহু জাগতিক ব্যাখ্যা (Many-Worlds Interpretation), যেখানে প্রিন্সটনের হিউ এভারেট বলেছিলেন, কোয়ান্টাম কণার প্রতিটি সম্ভাবনাই আসলে ঘটে সমান্তরাল মহাবিশ্বে!
অন্তহীন অনুসন্ধান
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন বিভক্তি নতুন নয়। নিউটনের যুগে আলোর প্রকৃতি—তরঙ্গ নাকি কণা, এ নিয়ে দুইশো বছরের বেশি বিতর্ক চলেছিল। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্ষেত্রেও হয়তো এই বিতর্ক দীর্ঘদিন চলবে।
তবে নেচার সাময়িকীর মতে, এই মতপার্থক্যই বিজ্ঞানকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রশ্ন থাকলেই গবেষণা চলে, আর গবেষণাই নতুন তত্ত্ব ও প্রযুক্তির জন্ম দেয়। তাই এটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, বরং বাস্তবতার স্বরূপ বোঝার এক অন্তহীন অনুসন্ধান। হয়তো কোনো একদিন কোয়ান্টাম সমীকরণ এবং বাস্তবতার মাঝে তফাত থাকবে না। ততদিন পর্যন্ত এটি রয়ে যাবে বিজ্ঞান ও বাস্তবতার মাঝের এক রহস্যময় সেতু।
এই প্রসঙ্গে রিচার্ড ফাইনম্যানের সেই মজার উক্তিটি মনে পড়ে গেল:
“If you think you understand quantum mechanics, you don’t understand quantum mechanics.”
তথ্যসূত্র: https://www.nature.com/articles/d41586-025-02342-y
