গবেষক জীবনের সূচনা ও ব্রিতে যোগদান
১৯৮৫ সাল। আমি তখন পঁচিশ বছরের টগবগে এক তরুণ। কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রী শেষ করে যোগ দিলাম বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট – ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগে। তরুণ গবেষক, চোখে আমার অনেক স্বপ্ন। আমাকে যে গবেষণা টিমে রাখা হয়েছিল, তার মূল কাজ ছিল বাংলাদেশের সেচনির্ভর বোরো মৌসুমের জন্য নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করা। আমাদের দেশের ধান উৎপাদনের সবচেয়ে ফলনশীল মৌসুমই হচ্ছে এই বোরো মৌসুম।
মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও তথ্য সংগ্রহ
সে সময় সাইন্টিফিক অফিসার হিসেবে আমার প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন ব্রিডিং নার্সারি আর ফলন পরীক্ষার প্লট থেকে ডেটা সংগ্রহ করা। মাঠে মাঠে ঘুরে ডেটা নেওয়া, ফলন তুলনা করা, এসব নিয়েই কাটত দিন। এর পাশাপাশি কাজের ফাঁকে ছিল সহকর্মীদের সাথে চায়ের টেবিলে বসে গল্প স্বল্প। চমৎকার একটা কাজের পরিবেশ ছিল ব্রি -তে।
নজরকাড়া দুটি বিশেষ ব্রিডিং লাইন
ব্রি-তে ধানের উন্নত জাতের ফলন নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা চলত। সে সব পরীক্ষার মধ্যেই দুটি ব্রিডিং লাইন বারবার সবার নজর কেড়ে নিত, এ দুটো লাইনের ব্রির্ডাস কোড ছিল: বিআর ৬০১-৩-৩-৪-২-৫ এবং বিআর ৮০২-১১৮-৪-২।
উচ্চ ফলনশীল জাতের সম্ভাবনা
অন্যসব ব্রিডিং লাইন আর চেক ভ্যারাইটিগুলোর তুলনায় এ দুটো লাইন সব ক্ষেত্রেই ভালো ফলন দিত।
ব্রিডিং লাইন দুটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য
তবে এ দুটো লাইনের বৈশিষ্ট্য ছিল আলাদা। বিআর ৬০১ ছিল আগাম লাইন, আর বিআর ৮০২ তুলনামূলকভাবে দেরিতে ফলন দিত। আমরা এগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা করেছিলাম। ফলাফল দেখে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেল, এই দুইটি লাইন ভবিষ্যতে নতুন জাত হিসেবে মুক্তি পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রাখে।
উচ্চশিক্ষা শেষে ব্রিতে প্রত্যাবর্তন
এর মধ্যেই ১৯৯০ সালে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাই। টেক্সাস এ এন্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ প্রজননে উচ্চতর ডিগ্রি শেষ করে ১৯৯৪ সালের শুরুতে আবার ব্রি-তে ফিরে এলাম। ফিরে এসে দেখলাম, ঐ দু’টো লাইন ইতোমধ্যেই সব ফলন পরীক্ষা শেষ করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত।
প্রযুক্তিগত নথি ও অনুমোদনের প্রস্তুতি
সেই সময় আমার পোস্টিং হয়েছিল জেনেটিক রিসোর্স ও সিড ডিভিশনে। সেখানে কাজ করতে গিয়ে এ দুটো লাইনের যাবতীয় তথ্য জাতীয় বীজ বোর্ডে জমা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত কাগজপত্র তৈরির কাজে যুক্ত হলাম।
ব্রি ধান-২৮ ও ব্রি ধান-২৯ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা
অবশেষে ১৯৯৪ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বিআর ৬০১-৩-৩-৪-২-৫ এবং বিআর ৮০২-১১৮-৪-২ এই দুটো লাইনকে যথাক্রমে ব্রি ধান-২৮ এবং ব্রি ধান-২৯ নামে নতুন জাত হিসেবে অনুমোদন দেয়।
ধানের নামকরণে নতুন ধারার প্রবর্তন
এখানে বলে রাখি, সে বছর থেকেই ব্রি উদ্ভাবিত ধানের নামকরণের একটু পরিবর্তন আসে। আগে জাতগুলোকে “বিআর” প্রিফিক্স দিয়ে প্রকাশ করা হতো: যেমন: বিআর ১১, বিআর১৪। কিন্তু সে বছর থেকেই, ব্রি ধান প্রিফিক্স চালু করা হয়।
মেগা ভ্যারাইটি হিসেবে দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা
এরপরের গল্প অনেকেরই জানা। উচ্চ ফলন আর ভালো চালের কারণে ব্রি ধান-২৮ এবং ব্রি ধান-২৯ খুব দ্রুতই কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সময়ের সাথে সাথে “মেগা ভ্যারাইটি” হিসেবে সারাদেশে সুপরিচিত লাভ করে। তারপর বহু বছর ধরে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এ দু’টো ভ্যারাইটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
প্রবাস জীবন ও ব্রি-র সঙ্গে অটুট বন্ধন
১৯৯৫ সালে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে অভিবাসন নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসি। পেশাগত জীবনে এদেশের কেন্দ্রীয় সরকারের প্ল্যান্ট ব্রিডার্স রাইটস অফিসের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু ব্রি-র সঙ্গে সম্পর্কটা কখনোই শেষ হয়ে যায়নি। পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। ব্রি-র সাফল্যের খবর শুনলে আজও ভীষণ ভালো লাগে, গর্ব হয়।
কৃষি অর্থনীতিতে বিআরআরআই-এর প্রভাব
বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্রি সত্যিই এক অনন্য প্রতিষ্ঠান,যার অবদান দেশের কৃষি অর্থনীতিতে অপরিসীম।
আধুনিক ধান গবেষণার বিবর্তন
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রি-র গবেষণা কার্যক্রম আরো জোরদার হয়েছে। নতুন নতুন চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, লবণাক্ততা, খরা কিংবা জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার কথা মাথায় রেখে একের পর এক আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্রি মোট ১২৭টি আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু হাইব্রিড ভ্যারাইটিও রয়েছে।
জলবায়ু সহনশীল নতুন জাতের উদ্ভাবন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু নতুন জাত কৃষকদের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—যেমন ব্রি ধান-৮১, ব্রি ধান-৮৪, ব্রি ধান-৮৬, ব্রি ধান-৮৮, ব্রি ধান-৯১, ব্রি ধান-৯৬, ব্রি ধান-১০২, ব্রি ধান-১০৫, ব্রি ধান-১০৮ এবং ব্রি ধান- ১১১। এসব জাতের মধ্যে কোনটি আগাম পরিপক্ব, কোনটি খরা সহনশীল, কোনটি আবার লবণাক্ততা, জলমগ্নতা বা রোগবালাই সহনশীল অর্থাৎ পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই এখানে প্রধান লক্ষ্য।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও নতুন প্রজন্মের গবেষক
তবে সামনের পথটা এতো সহজ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় এসব কারণে ভবিষ্যতের উদ্ভিদ প্রজননবিদদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তবু আমার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের গবেষকেরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত এবং আরও সচেতন। সাম্প্রতিক গবেষণার ধারা দেখলেই বোঝা যায় তাঁরা ঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
