Sunday, March 1, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশস্মার্ট রাইস: জলবায়ু সঙ্কটে নীরব বিপ্লব

স্মার্ট রাইস: জলবায়ু সঙ্কটে নীরব বিপ্লব

কৃষির নতুন পরীক্ষা ও স্মার্ট রাইস

বাংলার ইতিহাস লিখতে গেলে ধানের কথাই আগে আসে। নদী বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু ধান রয়ে গেছে মানুষের বেঁচে থাকার কেন্দ্রবিন্দুতে। আজ সেই ধানই দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক পরীক্ষার মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি খরা, নতুন রোগবালাই এসব মিলিয়ে কৃষি এখন এক অস্থির সময় পার করছে। এই প্রেক্ষাপটে স্মার্ট রাইস কেবল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং কৃষিকে টিকিয়ে রাখার এক কৌশলগত প্রচেষ্টা।

লবণাক্ততা মোকাবিলায় ব্রি-এর উদ্ভাবন

বাংলাদেশে এই অভিযাত্রার অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য উদ্ভাবিত ব্রি ধান ৬৭ লবণাক্ত মাটিতে ফলন ধরে রাখতে পারে। একইভাবে ব্রি ধান ৪৭ ও ব্রি ধান ৭৩ উপকূল অঞ্চলে লবণ সহনশীলতার জন্য পরিচিত। এ দুটো জাত যথাক্রমে বোরো ও আমন মৌসুমে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করছে এবং উপকূলের পতিত জমিকে আবার উৎপাদনের আওতায় আনছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রি ধান ৯৭-এর মতো জাতও উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে আশাব্যঞ্জক ফলন দিচ্ছে।

বন্যা ও প্লাবন সহনশীল জাত

বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান ৫১ ও ৫২ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; এদের মধ্যে থাকা সাবমার্জেন্স সহনশীল বৈশিষ্ট্য গাছকে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকেও পুনরুজ্জীবিত হতে সক্ষম করে। একই ধারাবাহিকতায় ব্রি ধান ৭৯-এর মতো জাতও নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক প্লাবনের ঝুঁকি সামলে দ্রুত পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

খরা, হাওর ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য

আবার খরা-প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য ব্রি ধান ৫৬ ও ৫৭ তুলনামূলকভাবে কম পানিতে টিকে থাকতে পারে এবং স্থিতিশীল ফলন দেয়। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক ব্রি ধান ৯৬ হাওর এলাকার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী, আগাম বন্যা ও চৈত্রের ঢল থেকে এ ধান সুরক্ষিত থাকে। কারণ এটি প্লাবন আসার আগেই কেটে ঘরে তোলার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ একই দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের ভেতরেই বিভিন্ন স্মার্ট বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

জলাবদ্ধতা ও নিচু এলাকার সম্ভাবনা

ব্রি ধান ৯১ ও ব্রি ধান ১১১ জলাবদ্ধ ও নিচু আমন অঞ্চলের জন্য উল্লেখযোগ্য নতুন জাত। ব্রি ধান ৯১ অগভীর থেকে মাঝারি পানিতে স্থিতিশীল ফলন দেয়, আর ব্রি ধান ১১১ জলি জমিতে উন্নত ফলনশীলতা দেখায়। ফলে নিম্নাঞ্চলীয় কৃষিতে এ দুটি জাত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান ও খাদ্যপ্রাপ্যতা

পুষ্টিগত দিক থেকেও স্মার্ট রাইসের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন করা হয়েছে জিংক ও আয়রন সমৃদ্ধ ধানের জাত, যাতে অপুষ্টিজনিত সমস্যা কমানো যায়। বাংলাদেশেও ব্রি ধান ৬২ ও ব্রি ধান ৮৪-এর মতো জিংক ও আয়রন সমৃদ্ধ স্বল্পমেয়াদি জাত দ্রুত ফলন দিয়ে কৃষককে অতিরিক্ত ফসল চক্রের সুযোগ দেয়, যেটা সামগ্রিক খাদ্যপ্রাপ্যতা বাড়ায়।

আবার কিছু জাত ব্রাউন প্ল্যান্টহপার পোকা অথবা ব্লাস্ট রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলা হয়েছে, যাতে রাসায়নিক কীটনাশকের বা বালাইনাশকের ব্যবহার কমানো যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও অভিযোজন

আন্তর্জাতিক পরিসরে, ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট জলবায়ু-সহনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তাদের গবেষণায় খরা-সহনশীল সাহভাগী ধান কিংবা লবণ সহনশীল স্কুবা রাইসের মতো জাত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃষকদের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হয়েছে। সেই বৈশ্বিক গবেষণার সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশীয় বাস্তবতায় অভিযোজিত স্মার্ট রাইসের ধারাবাহিক উন্নয়ন চালিয়ে যাচ্ছে।

তাপমাত্রা সহনশীলতা ও টেকসই কৃষি

এছাড়া উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধানের জাত নিয়েও গবেষণা চলছে, কারণ ভবিষ্যতে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পরাগায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু নতুন ব্রিডিং লাইনে এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য সংযোজন করা হয়েছে, যেটা তাপমাত্রা ৩৫–৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেও ধানের শিষ গঠন স্বাভাবিক রাখতে পারে। এভাবে স্মার্ট রাইস কেবল পরিবেশগত সহনশীলতা নয়, টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকেও অগ্রসর হচ্ছে।

স্মার্ট কৃষি-ব্যবস্থার বাস্তবায়ন

তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে একটি বাস্তবতা জড়িয়ে আছে। উন্নত জাত তৈরি করাই শেষ কথা নয়; সেগুলিকে মাঠে সঠিকভাবে ব্যবহারের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া আরও জরুরি। সেচব্যবস্থা, মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, বীজের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং কৃষকের প্রশিক্ষণ সবকিছু মিলেই একটি স্মার্ট কৃষি-ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। স্মার্ট রাইস তখন আর কেবল একটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি থাকে না; এটি হয়ে ওঠে কৃষি-অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অংশ।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে খাদ্য নিরাপত্তা মানে কেবল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং অনিশ্চয়তার মধ্যে উৎপাদন ধরে রাখা। সেই অর্থে স্মার্ট রাইস হলো অভিযোজনের নয়া কৌশল, যেটা কৃষিকে ভবিষ্যতের ঝুঁকির সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত করে। স্মার্ট রাইস সেই প্রস্তুতির নতুন অধ্যায়, যেখানে ধানের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিজ্ঞানের দূরদৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার গভীর প্রয়াস।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular