Sunday, March 1, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeকোয়ান্টাম বিজ্ঞানহাইপার ডাইমেনশন: অদেখা জগত

হাইপার ডাইমেনশন: অদেখা জগত

আমাদের পরিচিত জগত ও মাত্রার ধারণা

আমাদের চারপাশের যে জগতটাকে আমরা চোখের সামনে দেখি, সেটা মূলত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা এই তিন মাত্রার জগত। এই তিনটি স্হানিক মাত্রার পাশাপাশি আরেকটি মাত্রার উপস্থিতি আমরা অবশ্য বুঝতে পারি, সেটা হল সময়। তবে সময় কোন স্হানিক মাত্রা নয়। সময়ের প্রভাবে আমাদের চারপাশের দৃশ্যপট বদলে যায়। অর্থাৎ আমাদের কাছে বাস্তবতা হলো – দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এবং সময় এই চারটি মাত্রার সমন্বয়ে স্হান-কালের বুননে তৈরি এক জগত। এর বাইরে কিছু কল্পনা করলেই মাথা ঘুরে যায়।

কিন্তু বিজ্ঞান ঠিক এখানেই থেমে যায় না। মানুষের দৃষ্টির সীমা যেখানে শেষ হয়, বিজ্ঞানের প্রশ্ন সেখান থেকেই শুরু। সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে হাইপার ডাইমেনশন-এর ধারণা – তিনটির বেশি স্থানের মাত্রা নিয়ে গঠিত এক অদ্ভুত, অদেখা বাস্তবতা।

হাইপার ডাইমেনশন বুঝতে গেলে আগে মাত্রা জিনিসটাই একটু ভেঙে বুঝতে হবে। এক মাত্রার জগতে আছে শুধু একটি সরলরেখা। এখানে সামনে আর পিছনে ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার কোন উপায় নেই। দুই মাত্রায় সেই সরলরেখা চওড়া হয়ে তৈরি হয় একটি সমতল। এখানে ডানে ও বামে যাওয়া সম্ভব। এরপর‌ একাধিক সমতল নিয়ে তৈরি হয় তৃতীয় মাত্রা – উচ্চতা- এখানে উপরে ও নিচে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু তারপর?

চতুর্থ মাত্রা ও টেসার‍্যাক্ট

এবার টেসার‍্যাক্টের কথা না বললে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। টেসার‍্যাক্ট হলো চারটি স্হানিক মাত্রার হাইপোথেটিক্যাল একটি ঘনক। সমতলকে উপর-নীচ করে যেমন তিন মাত্রার ঘনক তৈরি করা যায়, তেমনি একটি ত্রিমাত্রিক ঘনককে আমাদের অচেনা আরেকটি দিক বরাবর প্রসারিত করলে কল্পনায় উঠে আসে টেসার‍্যাক্ট।

টেসার‍্যাক্ট
টেসার‍্যাক্ট

আমরা একে সরাসরি দেখতে পারি না, শুধু তার তিন-মাত্রিক ছায়া বা প্রক্ষেপণটাই চোখে পড়ে, যেটা আমাদের কাছে অদ্ভুত ও ভাঁজ করা মনে হয় (ছবিতে ক্লিক করে দেখুন)। টেসার‍্যাক্টের এই অস্বাভাবিকতাই আসলে বলে দেয়, সমস্যাটা আকৃতির নয়, সমস্যাটা আমাদের দৃষ্টি সীমায়। টেসার‍্যাক্ট তাই হাইপার ডাইমেনশনের সবচেয়ে সহজ অথচ শক্তিশালী প্রতীক।

এখন কল্পনা করুন, সামনে-পিছনে, ডান-বাম এবং উপর-নিচ, এই তিন দিকের বাইরেও আরেকটি দিক আছে, কিন্তু সেটা রয়েছে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এটা আমাদের অজানা, কোনো পরিচিত দিক নয়। আমরা যেমন কাগজের ওপর আঁকা দুই মাত্রার ছবিকে তৃতীয় মাত্রায় তুলে ধরতে পারি, তেমনি হয়তো আমাদের এই তিন মাত্রার জগতও কোনো উচ্চতর মাত্রার বাস্তবতার এক ক্ষুদ্র ছায়া মাত্র।

স্ট্রিং থিওরি: বিন্দুর গভীরে স্ট্রিং

এই অদ্ভুত ভাবনাটা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে শক্ত ভিত পায় স্ট্রিং থিওরির হাত ধরে। স্ট্রিং থিওরি বলে, প্রকৃতির সবচেয়ে মৌলিক কণাগুলো আসলে বিন্দু নয়, বরং অতি সূক্ষ্ম কম্পমান “স্ট্রিং”। এই স্ট্রিংগুলোর কম্পনের ধরনই ঠিক করে দেয় একটি কণা ইলেকট্রন হবে, না কোয়ার্ক হবে, না কি অন্য কিছু।

কিন্তু এই কম্পন ঠিকভাবে বোঝাতে গেলে দেখা যায় আমাদের পরিচিত তিনটি মাত্রাই যথেষ্ট নয়। অংকের হিসেব মিলাতে গিয়ে স্ট্রিং তত্ত্ব দাবি করে, মহাবিশ্বে রয়েছে বেশ কিছু অতিরিক্ত মাত্রা – মোট দশ বা এগারোটি পর্যন্ত। এখানেই হাইপার ডাইমেনশন কল্পনা থেকে কঠিন গাণিতিক প্রয়োজনে চলে আসে।

অদৃশ্য মাত্রা কোথায় লুকিয়ে আছে?

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতগুলো মাত্রা থাকলে আমরা সেগুলো দেখি না কেন? স্ট্রিং থিওরির উত্তরটা বেশ মজার। অতিরিক্ত মাত্রাগুলো নাকি অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্কেলে গুটিয়ে আছে, এতটাই ছোট যে সরাসরি ধরা পড়ে না।

যেমন দূর থেকে একটি দড়ি দেখতে এক মাত্রার সরলরেখার মতো লাগে, কিন্তু খুব কাছে গেলে বোঝা যায় দড়িটির চারপাশে ঘোরার সুযোগ আছে। দূর থেকে আমাদের চোখে ধরা পড়ছে দড়ির দৈর্ঘ্য, কিন্তু তার গোলাকৃতি গভীরতা থেকে যাচ্ছে অদেখা। তেমনি এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলোও হয়তো প্রতিটি বিন্দুর ভেতরে ভাঁজ হয়ে লুকিয়ে আছে আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে।

মহাকর্ষ ও দুর্বলতার রহস্য

এই হাইপার ডাইমেনশন আর স্ট্রিং থিওরির মিলিত ধারণা আমাদের বাস্তবতার বহু পুরোনো ধাঁধার নতুন ব্যাখ্যা দেয়। মহাকর্ষ শক্তি কেন অন্য বলগুলোর তুলনায় এত দুর্বল – এই প্রশ্নের এক সম্ভাব্য উত্তর হলো, মহাকর্ষ হয়তো এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলোর ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাই আমাদের তিন মাত্রার জগতে এসে সেটাকে দুর্বল মনে হয়।

এমনকি স্ট্রিং তত্ত্বের অধুনা ভার্সন এম থিওরিতে এটাও বলা হয়, আমাদের পুরো মহাবিশ্বই এক ধরনের মেমব্রেন বা ঝিল্লির মতো, যেটা উচ্চতর মাত্রার এক বিশাল পরিসরের মধ্যে ভাসছে। আমরা সেই ঝিল্লির বাইরে যেতে পারি না বলেই হাইপার ডাইমেনশন আমাদের কাছে অধরা।

বিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধন

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ধারণাগুলো শুধু গবেষণাগারের সমীকরণে আটকে নেই। দর্শন, ধর্মীয় চিন্তা, আর পুরোনো কল্পকাহিনিতে বহুদিন ধরেই “অদৃশ্য জগৎ”, “উচ্চতর স্তর”, কিংবা “ভিন্ন বাস্তবতা”-এসব কথা শোনা যায়। স্ট্রিং থিওরি আর হাইপার ডাইমেনশন যেন সেই পুরোনো মানবিক কৌতূহলকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় নতুন করে বলছে। পার্থক্য একটাই – এখানে বিশ্বাসের জায়গায় রয়েছে বিজ্ঞান, আর কল্পনার জায়গায় রয়েছে গাণিতিক সমীকরণ।

শেষ কথা: বাস্তবতার অদেখা রূপ

তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায় – আমরা চারপাশে কি সত্যিই বাস্তবতার পুরো ছবিটা দেখছি? নাকি আমাদের এই পরিচিত জগত আসলে অনেক বড়, অনেক জটিল কোনো কাঠামোর এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র?

হাইপার ডাইমেনশন আর স্ট্রিং থিওরি একসাথে সেই সাহসী সম্ভাবনার দিকেই ইশারা করে। আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাস্তবতা সবসময় আমাদের অনুভূতি আর ইন্দ্রিয়ের সীমার মধ্যে বন্দি থাকে না। কখনো কখনো বাস্তবতা আমাদের কল্পনারও বহু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে – পারিপার্শ্বিকের আড়ালে নীরব এবং অদৃশ্য হয়ে।

 

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular