Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাবিশ্বের মহাবিস্ময়ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল: নক্ষত্র গিলে খাওয়ার বিরল দৃশ্য

ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল: নক্ষত্র গিলে খাওয়ার বিরল দৃশ্য

মহাজাগতিক অঘটন ও ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল

পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে এক মহাজাগতিক অঘটন ঘটেছে। বিশাল এক ব্ল্যাকহোল একটি নিরীহ নক্ষত্রকে গিলে ফেলেছে। দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন নক্ষত্রটিকে টেনে হেঁচড়ে নিজের মধ্যে নিয়ে নিচ্ছে।

এই ধরনের অদ্ভুত, রোমহর্ষক ঘটনাটিকেই বিজ্ঞানীরা বলেন “টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট”, সংক্ষেপে TDE। সম্প্রতি হাবল টেলিস্কোপ এই নাটকীয় দৃশ্যটি ধারণ করেছে। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ ঘটনাটিকে শনাক্ত করেছেন AT2024tvd নামে।

নক্ষত্রের মৃত্যু ও স্প্যাগেটিফিকেশন

ঘটনাটি শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। ক্যালিফোর্নিয়ার জুইকি ট্র্যানজিয়েন্ট ফ্যাসিলিটিতে প্রথমে একটি উজ্জ্বল আলোর ঝলক দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চমকে ওঠেন। এই আলোর উৎস আসলে ছিল একটি নক্ষত্র, যাকে একটি ব্ল্যাকহোল টেনে ছিঁড়ে গ্যাসের লম্বা ফিতায় পরিণত করছে।

কোনো নক্ষত্রকে ব্ল্যাকহোল যখন এভাবে ছিঁড়ে ফেলে টেনে নেয়, তখন বিজ্ঞানের ভাষায় সেই প্রক্রিয়াকে বলে “স্প্যাগেটিফিকেশন”। কারণ নক্ষত্রের দেহ দেখতে তখন হয় ঠিক যেন স্প্যাগেটির মতো দড়ি টানা টানা।

হাবল টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ ও বিরল অবস্থান

নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ, চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি আর ভেরি লার্জ অ্যারে একযোগে নজর রাখে এই ঘটনাটির ওপর। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একটি অস্বাভাবিক জায়গা থেকে আসছে এই TDE।

সাধারণত ব্ল্যাকহোল থাকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। কিন্তু এই ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল-কে দেখা গেছে তার নিজস্ব গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৬০০ আলোকবর্ষ দূরে, এক কোণার দিকে। আর এখানেই এই ঘটনাটির বিশেষত্ব।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি সম্ভবত একটি “ভবঘুরে” ব্ল্যাকহোল। অর্থাৎ, আগে এটি হয়তো অন্য কোনো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ছিল। পরে এক বা একাধিক গ্যালাক্সির সংঘর্ষে সেখান থেকে ছিটকে পড়ে এখন এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটি একদম বিরল ঘটনা, কারণ সাধারণত ব্ল্যাকহোল গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে এত দূরে থাকে না। আর এত স্পষ্টভাবে এই ভবঘুরে ব্ল্যাকহোলের উপস্থিতি এই প্রথম ধরা পড়ল।

ব্ল্যাকহোলের ভর ও উৎপত্তি রহস্য

এই ব্ল্যাকহোলের ভর প্রায় ১০ লাখ সূর্যের সমান বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে গ্যালাক্সিতে এটি রয়েছে, তার কেন্দ্রেও আরেকটি ব্ল্যাকহোল রয়েছে। আর সেটির ভর প্রায় ১০ কোটি সূর্যের সমান।

এত বড় দুটি ব্ল্যাকহোল একই গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা এবং একটির কেন্দ্র থেকে সরে বাইরে চলে আসা—এটি অত্যন্ত বিরল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আবিষ্কারের গুরুত্ব

এই ধরনের টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট বিজ্ঞানীদের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। যেমন:

  • সব ব্ল্যাকহোল কি গ্যালাক্সির মাঝখানে থাকে?
  • নাকি অনেকেই গ্যালাক্সির ভেতরে ঘুরে বেড়ায়?
  • কোনো ব্ল্যাকহোল কীভাবে নক্ষত্রকে গিলে ফেলে?
  • গ্রাস করার সময় কী ধরনের বিকিরণ বের হয়?

এইসব তথ্য এ ধরনের ঘটনাগুলো থেকেই জানা যায়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করল, ব্ল্যাকহোল শুধু গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নয়, গ্যালাক্সির ভেতরেও ঘুরে বেড়াতে পারে। AT2024tvd সেই ভবঘুরে ব্ল্যাকহোল-এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করল। মহাবিশ্বের অজানাকে জানার জন্যে বিজ্ঞানীদের জন্য এটি একেবারেই একটি অসাধারণ ঘটনা।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular