Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপদার্থ বিজ্ঞানমহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম তিন মিনিট: বিগ ব্যাং ও হিগস বোসন রহস্য

মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম তিন মিনিট: বিগ ব্যাং ও হিগস বোসন রহস্য

মহাবিশ্বের সূচনা ও তিন মিনিটের নাটক

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখন থেকে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণ বা ‘বিগ ব্যাং’-এর ফলে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম তিনটি মিনিট ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের ধারণা, মহাবিশ্বের যাবতীয় প্রাথমিক বস্তুকণা এই প্রথম তিন মিনিটের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল। মহাবিস্ফোরণের শক্তি থেকে প্রাথমিক বস্তুকণার রূপান্তর কীভাবে হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা দিয়েছেন।

তাঁরা বলেন, মহাবিস্ফোরণের ফলে অতি উচ্চ তাপমাত্রায় প্রচণ্ড শক্তি নির্গত হয়। ট্রিলিয়ন ডিগ্রি তাপমাত্রার এই মহাশক্তি থেকে খুব দ্রুতই কিছু প্রাথমিক বস্তুকণার উদ্ভব হয়, যা মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম তিন মিনিট-এর মধ্যেই কয়েক ধাপে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়েছিল।

নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্ম

এর পরপরই মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়, যা এখনো ক্রমেই প্রসারিত হয়েই চলেছে। পরবর্তীতে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম পরমাণু মহাকর্ষের ফলে পুঞ্জীভূত হয়ে বিভিন্ন নক্ষত্র, নেবুলা এবং গ্যালাক্সির জন্ম দেয়, যা এখন আমাদের পরিচিত মহাবিশ্বের অংশ।

তিন মিনিট কোনো দীর্ঘ সময় নয়। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ক্ষণস্থায়ী প্রাথমিক কণার উদ্ভব কীভাবে হলো! আর এই কণাগুলোর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে এই অল্প সময়ের মধ্যেই কেমন করে শক্তি থেকে বস্তুর সৃষ্টি হলো!

হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণা

এর মধ্যে একটি কণা, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন হিগস বোসন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা মনে করেন, এই কণাটি থেকেই বস্তুর ভরের (mass) উৎপত্তি হয়। আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণে দেখিয়েছেন, বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তর করা যেমন সম্ভব, তেমনি শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তর করাও অসম্ভব নয়। সৃষ্টির সূচনায় এই অসম্ভবটিই সম্ভব করেছিলো হিগস বোসন, যাকে অনেকে বলেন “ঈশ্বর কণা”।

এগুলি সবই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের কথা। কিন্ত শুধু তত্ত্ব দিলেই তো হবে না, তত্ত্ব প্রমাণ করা চাই। হিগস বোসনকে খুঁজে বের করাটা তাই খুবই জরুরী।

সার্ন ও মহাবিশ্বের রহস্যভেদ

আর এই কাজটিই করছেন সার্নের বিজ্ঞানীরা। সার্ন (CERN) হলো ইউরোপিয়ান নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সংক্ষিপ্ত নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পার্টিকেল এক্সেলেটর, লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC), এখানেই অবস্থিত।

এলএইচসি দিয়েই তাঁরা মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছেন। এটা করতে হলে কিছু কৃত্রিম বিগ ব্যাং ঘটাতে হবে এলএইচসি-র ভেতর। তাহলেই পদার্থের আদিম রূপটি দেখা যেতে পারে।

ভূপৃষ্ঠের ১০০ মিটার নিচে এলএইচসি-র অবস্থান। এর ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ চক্রাকার টানেল চলে গেছে মাটির নিচ দিয়ে। এর কিছুটা অংশ ফ্রান্সের ভিতর আর কিছুটা অংশ সুইজারল্যান্ড-এর মধ্যে। এর বিভিন্ন স্থানে আছে বিশাল ম্যাগনেট আর পার্টিকেল ডিটেকটর।

লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের কার্যপদ্ধতি

এলএইচসি-র ভেতর খুবই উচ্চশক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। প্রোটন কণাগুলোকে দুটি বিপরীতমুখী টিউব দিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে পরিচালনা করে প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাদের মধ্যে ঘটানো হয় সংঘর্ষ।

প্রচণ্ড এই সংঘর্ষের ফলে প্রোটন কণাগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে তাদের আদি অবস্থায় ফিরে যায়। এটি হলো সেই আদি অবস্থা, যেটা মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে বিরাজমান ছিল। এই সংঘর্ষের ফলে যে সব কণা তৈরি হয় সেগুলো খুবই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এলএইচসি-র পার্টিকেল ডিটেকটরে সেগুলো ধরা পড়ে।

অনিশ্চয়তা ও আগামীর অপেক্ষা

এলএইচসি-র পরীক্ষায় হিগস বোসন মশাই একবার এক ঝলকের জন্য দেখা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। তাই তাঁরা আরো উচ্চশক্তির পরীক্ষা চালানোর অপেক্ষায় আছেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এভাবেই তাঁরা একদিন সৃষ্টির প্রথম তিন মিনিটের রহস্য ভেদ করবেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular