Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানপ্রাইম এডিটিং: ক্রিসপারের চেয়েও নির্ভুল প্রযুক্তি

প্রাইম এডিটিং: ক্রিসপারের চেয়েও নির্ভুল প্রযুক্তি

২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর বিশ্বখ্যাত নেচার জার্নালে একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এতে জিন এডিটিংয়ের নতুন এক পদ্ধতির কথা জানান। এর নাম প্রাইম এডিটিং। গবেষকদের দাবি, এই নতুন প্রযুক্তি প্রচলিত ক্রিসপার ক্যাস-৯ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং কার্যকর।

ক্রিসপারের সীমাবদ্ধতা ও নতুন সমাধান

আমরা জানি, মানুষের শরীরে নানান ধরনের জটিল জেনেটিক রোগ দেখা যায়। এগুলো সাধারণত জিনের মধ্যে হওয়া মিউটেশন বা পরিবর্তনের ফল। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন এইসব পরিবর্তনকে ঠিক করে জিনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার। এর মাধ্যমে রোগ সারানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

এই ক্ষেত্রে ক্রিসপার ক্যাস-৯ প্রযুক্তি বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিন্তু এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন, এটি অনেক সময় ভুল জায়গায় ডিএনএ কেটে ফেলে। একে বলা হয় অফ-টার্গেট এফেক্ট। ফলে মানুষের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে।

তবে প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিতে এমন ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা অনেক কম। গবেষণাগারে মানুষের ও ইঁদুরের কোষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এর প্রমাণ পেয়েছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিটি অনেক বেশি নির্ভুল। এমনকি তাঁরা সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং টে-স্যাকস রোগের মতো মারাত্মক জেনেটিক রোগের সংশ্লিষ্ট জিনের ত্রুটি এই পদ্ধতিতে মেরামত করতে পেরেছেন।

প্রাইম এডিটিং কীভাবে কাজ করে?

ক্রিসপার ক্যাস-৯ যেখানে ডিএনএ-র দুটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়, সেখানে প্রাইম এডিটিং কাটে শুধুমাত্র একটি স্ট্র্যান্ড। এই পদ্ধতিতে কোনো আলাদা ডোনার ডিএনএ ব্যবহৃত হয় না।

বিজ্ঞানীরা এখানে ক্যাস-৯ প্রোটিনের সাথে একটি রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম জুড়ে দিয়েছেন। এর সাথে থাকে একটি বিশেষ নির্দেশক আরএনএ। এর নাম পিইজি-আরএনএ (প্রাইম এডিটিং গাইড-আরএনএ)। এই পিইজি-আরএনএ দুটি কাজ করে: ১. এটি টার্গেট করা জিনকে চিনে ফেলে। ২. জিনের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত বহন করে।

টার্গেট স্পট চিহ্নিত হওয়ার পর ক্যাস-৯ প্রোটিন ডিএনএ-র একটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়। তারপর রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম সেই অংশে নতুন ডিএনএ অনুলিপি তৈরি করে বসিয়ে দেয়। ব্যাপারটা শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হতে পারে। তবে বাস্তবে সেটাই সম্ভব করে তুলেছেন হার্ভার্ডের বিজ্ঞানীরা।

তাঁরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষের ডিএনএ-তে ১৭৫টির বেশি নির্ভুল এডিটিং করতে পেরেছেন। তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের শরীরের প্রায় ৮৯ শতাংশ জেনেটিক রোগের প্রতিকার সম্ভব।

সাম্প্রতিক গবেষণা ও অগ্রগতি

২০১৯ সালের পর থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালে ব্রড ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইম এডিটিং-এর আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে। এর একটি সংস্করণের নাম পিই-ম্যাক্স (PE-max)। এটি প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এই পদ্ধতিটি জীবন্ত প্রাণীর দেহেও পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জিন এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে এটা এক বিশাল অগ্রগতি।

২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কিছু বায়োটেক কোম্পানি এই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে মানুষের উপর পরীক্ষামূলক চিকিৎসা শুরু করেছে। বিশেষ করে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, লিভারের জিনগত সমস্যা এবং চোখের রেটিনার জটিলতাগুলোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধাপের গবেষণা শুরু হয়েছে।

ভবিষৎ সম্ভাবনা

২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল গবেষকদের আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ এর নিরাপত্তা ভালো এবং অফ-টার্গেট এফেক্ট প্রায় নেই বললেই চলে। যদিও এখনো ব্যাপকভাবে মানবদেহে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়নি, তবে প্রাথমিক ফলাফল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক।

মনে রাখতে হবে, প্রাইম এডিটিং এখনো একটি নতুন প্রযুক্তি। এটি নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো প্রয়োজন। তবে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই হয়তো আমরা জেনেটিক রোগ থেকে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাব। হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন ডাক্তাররা কেবল নির্ভুল জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমেই মানুষের কঠিন রোগ সারিয়ে তুলবেন।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular