Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানপ্লুটো: গ্রহের মর্যাদা হারানো ও বামন গ্রহের রহস্য

প্লুটো: গ্রহের মর্যাদা হারানো ও বামন গ্রহের রহস্য

সৌরজগতের নবম সদস্য ও পতন

ছোটবেলায় পাঠ্য বইতে আমরা অনেকেই পড়েছি সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা নয়টি। সূর্য থেকে দূরত্বের ক্রমানুসারে এই নয়টি গ্রহ হলো: বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন এবং প্লুটো। ১৯৩০ সালে সূর্যের সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ হিসেবে প্লুটো আবিষ্কৃত হয়েছিলো।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই তথ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন বলা হচ্ছে, সৌরজগতে গ্রহ রয়েছে আটটি। নবম গ্রহ প্লুটো তার গ্রহের মর্যাদা হারিয়েছে। ২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়ন (IAU) প্লুটোকে পদাবনতি দিয়ে ‘বামন গ্রহ’ বা ‘ডুয়ার্ফ প্ল্যানেট’ (Dwarf Planet) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

গ্রহ হওয়ার ৩টি শর্ত

এর কারণ অবশ্য IAU ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলেছে সৌরজগতে গ্রহের মর্যাদা পেতে হলে কোন মহাজাগতিক বস্তুকে তিনটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হবে:

১. সূর্য কেন্দ্রিক: বস্তুটিকে অবশ্যই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে হবে। ২. গোলাকৃতি: এর হাইড্রোস্ট্যাটিক ইকুলিব্রিয়াম থাকতে হবে, অর্থাৎ নিজস্ব অভিকর্ষ বলের প্রভাবে একে মোটামুটিভাবে গোলাকৃতি হতে হবে। ৩. কক্ষপথ পরিষ্কার: এর যথেষ্ট ভর থাকতে হবে, যার ফলে এর কক্ষপথের আশেপাশে অন্য কোন মহাজাগতিক বস্তুর (উপগ্রহ ছাড়া) প্রভাব থাকবে না। অর্থাৎ এর মহাকর্ষ বল দিয়ে কক্ষপথকে ‘ক্লিয়ার’ রাখতে হবে।

কেন প্লুটো গ্রহ নয়?

প্লুটো উপরের প্রথম দুটো শর্ত পূরণ করতে পারলেও, তৃতীয় শর্তটিতে এসে মার খেয়ে গেছে। এর কারণ হলো গ্রহ হিসেবে প্লুটো আয়তনে খুবই ছোট এবং এর মহাকর্ষ বল দুর্বল।

  • প্লুটোর আয়তন আমাদের পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদের দুই-তৃতীয়াংশ।
  • এর ব্যাসার্ধ পৃথিবীর ব্যাসার্ধের মাত্র ছয় ভাগের একভাগ।
  • প্লুটোর মহাকর্ষ বল পৃথিবীর মহাকর্ষের মাত্র ১৫ ভাগের এক ভাগ।

অর্থাৎ পৃথিবীতে আপনার ওজন যদি ৬০ কেজি হয়, প্লুটোতে আপনার ওজন হবে মাত্র ৪ কেজি। বলাই বাহুল্য, প্লুটোতে গেলে আপনি নিজেকে খুবই হালকা বোধ করবেন! এই দুর্বল মহাকর্ষ বলের কারণেই প্লুটো তার কক্ষপথ থেকে অন্য বস্তু সরাতে পারেনি এবং সৌরজগতের ‘এলিট প্ল্যানেটরি ক্লাব’-এর সদস্যপদ হারিয়েছে।

অন্যান্য বামন গ্রহ ও বিতর্ক

প্লুটোর ভাগ্যে জুটেছে বামন গ্রহের তকমা। তবে প্লুটো একা নয়, সৌরজগতে আরো চারটি স্বীকৃত বামন গ্রহ রয়েছে। এদের নাম হলো—এরিস, সেরেস, হাউমেয়া এবং মাকিমাকি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্লুটোকে যদি গ্রহের মর্যাদা দিতে হয়, তবে এদেরকেও গ্রহ হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। সেই জটিলতা এড়াতেই প্লুটোকে বামন গ্রহ হিসেবে ডিমোশন দেয়া হয়েছে। যদিও এ কারণে অনেকেই সে সময় নাখোশ হয়েছিলেন এবং অনেকেই এর প্রতিবাদও করেছিলেন।

প্লুটোর জগত: উপগ্রহ ও সময়

সাইজে ছোটখাটো হলেও, প্লুটোর নিজস্ব সংসার রয়েছে। এর পাঁচটি উপগ্রহ আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উপগ্রহটির নাম হলো, ক্যারন (Charon)। এর আকার প্লুটোর আকারের প্রায় অর্ধেক। প্লুটোর গতিবিধির উপর ক্যারনের মহাকর্ষের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। সৌরজগতের প্রান্তসীমায় প্লুটো এবং ক্যারন একত্রে একটি ‘ডাবল প্ল্যানেট সিস্টেম’ বা গ্রাভিটেশনাল সিস্টেম হিসেবে কাজ করে।

পৃথিবী থেকে প্লুটোর দূরত্ব প্রায় ৫.৩ বিলিয়ন কিলোমিটার এবং সূর্য থেকে ৫.৯ বিলিয়ন কিলোমিটার। এই বিশাল দূরত্বে থেকে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে প্লুটোর সময় লাগে পৃথিবীর ২৪৮ বছরের সমান। অর্থাৎ পৃথিবীতে আপনার বয়স এখন ৬২ বছর হলে, প্লুটোতে আপনার বয়স হতো মাত্র তিন মাস। বোঝাই যাচ্ছে, প্লুটোতে থাকতে পারলে হালকা-পাতলা থাকার পাশাপাশি চিরশিশু হওয়া যেত!

নিউ হরাইজন মিশন ও সৌন্দর্য

প্লুটোকে কাছ থেকে দেখার জন্য ২০০৬ সালে নাসা উৎক্ষেপণ করেছিল মহাকাশযান “নিউ হরাইজন”। প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছাতে এর সময় লেগেছিল পাক্কা নয় বছর।

২০১৫ সালে নিউ হরাইজন প্লুটোর বেশ কিছু অনবদ্য ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এরকম একটি ছবিতে প্লুটোর গায়ে বিশাল হৃদপিণ্ড আকৃতির এক ভূখণ্ড দেখা যায়, যা এর অনন্য সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। বামন হলেও প্লুটোর এই রূপ দেখে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—বিশেষ বিবেচনায় প্লুটোকে কি তার গ্রহের মর্যাদা আবার ফিরিয়ে দেওয়া যায় না? মহাকাশ বিজ্ঞানে সেই বিতর্ক আজও চলছে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular