বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কেবল কয়েকজন বিজ্ঞানীর ব্যক্তিগত সম্মান নয়; এটি আসলে মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার এক একটি মাইলফলক। প্রতি বছর এই পুরস্কারের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি—মানুষ প্রকৃতির কোন গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেয়েছে, আর কোন আবিষ্কারগুলো ভবিষ্যতের পথ খুলে দিয়েছে।
২০২৫ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের তিনটি ক্ষেত্রে এবারের আবিষ্কারগুলো মানবদেহের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কোয়ান্টামের বিস্ময়কর আচরণ এবং আধুনিক উপাদান বিজ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ পর্যন্ত বিস্তৃত। আসুন, বিস্তারিত দেখে নেওয়া যাক।
১. চিকিৎসাবিজ্ঞান: ইমিউন টলারেন্সের রহস্যভেদ
২০২৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে (ফিজিওলজি বা মেডিসিন) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন:
- মেরি ব্রাঙ্কো (আমেরিকা)
- ফ্রেড রামসডেল (আমেরিকা)
- শিমন সাগাগুচি (জাপান)
তাঁরা এই সম্মান পেয়েছেন মানবদেহের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রহস্য উন্মোচনের জন্য, যার নাম “পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স”।
রেগুলেটরি টি সেল ও অটোইমিউন রোগ
আমাদের ইমিউন সিস্টেমের প্রধান কাজ হলো জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ রাখা। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে আরেকটি কঠিন কাজ শিখতে হয়—নিজের শরীরের কোষকে শত্রু ভেবে আক্রমণ না করা। এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই টাইপ–১ ডায়াবেটিস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগ দেখা দেয়।
এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখে এক বিশেষ ধরনের কোষ, যাদের বলা হয় রেগুলেটরি টি সেল (Treg)। জাপানি বিজ্ঞানী শিমন সাগাগুচি প্রথম এই কোষগুলোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরে মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড রামসডেল আবিষ্কার করেন Foxp3 নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিন, যা এই কোষগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করে।
গবেষণায় দেখা যায়, এই জিনে ত্রুটি দেখা দিলে ইমিউন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং শরীর নিজেকেই আক্রমণ করতে শুরু করে। এই কাজের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আমাদের দেহে আসলে দুটি স্তরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ করে। প্রথমটি হলো, সেন্ট্রাল টলারেন্স, যেটা থাইমাস ও বোন ম্যারোতে নতুন তৈরি হওয়া ইমিউন কোষগুলোকে পরীক্ষা করে ভুল কোষ বাদ দেয়। আর দ্বিতীয়টি হলো, পেরিফেরাল টলারেন্স, যেটা সারা শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইমিউন কোষগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এই আবিষ্কার শুধু অটোইমিউন রোগ বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ক্যানসার চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং জিন থেরাপির নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে। মানবদেহের ভেতরের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বোঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২. পদার্থবিজ্ঞান: বড় জগতেও কোয়ান্টামের নিয়ম
এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন মার্কিন বিজ্ঞানী:
- জন ক্লার্ক
- মিশেল ডেভোরে
- জন মার্টিনিস
তাঁদের গবেষণা আমাদের দেখিয়েছে, কোয়ান্টামের রহস্যময় নিয়ম শুধু ইলেকট্রনের মতো ক্ষুদ্র কণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বড় সিস্টেমেও সেই নিয়ম কার্যকর হতে পারে।
ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং
কোয়ান্টাম জগতের নিয়মগুলো আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেক সময়ই মেলে না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, কোয়ান্টাম টানেলিং। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কণাকে যদি শক্ত দেয়ালের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি সব সময় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে না। কখনো কখনো সেটি দেয়াল ভেদ করে অন্য পাশে চলে যেতে পারে। এতদিন এই কোয়ান্টাম টানেলিং মূলত ইলেকট্রনের মতো অতি ক্ষুদ্র কণার মধ্যেই দেখা গেছে।
কিন্তু এবারের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা দেখালেন, এই ধরনের টানেলিং বড় আকারের বৈদ্যুতিক সার্কিটেও ঘটতে পারে। তাঁরা তৈরি করছেন বিশেষ ধরনের সুপারকন্ডাক্টর সার্কিট, যেখানে লক্ষ লক্ষ কণা এমনভাবে একসঙ্গে কাজ করে যে পুরো সার্কিটটিই একটি বিশাল কোয়ান্টাম সিস্টেমে পরিণত হয়। এই সার্কিট কখনো স্থির অবস্থায় থাকে, আবার হঠাৎ করেই কোয়ান্টামের নিয়ম মেনে বাধা পার হয়ে নতুন অবস্থায় চলে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয়, “ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং”।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সার্কিটে শক্তি ধীরে ধীরে বাড়ে না; বরং এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে লাফ দিয়ে বাড়ে। একে বলা হয়, শক্তির কোয়ান্টাইজেশন। এটি প্রমাণ করে, প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো ধারাবাহিক নয়, বরং ধাপে ধাপে কাজ করে।
এই গবেষণার ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধরনের সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার; ভবিষ্যতের সেই যন্ত্র, একসঙ্গে অসংখ্য জটিল হিসাব করতে পারবে, যেটা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে অসম্ভব।
৩. রসায়ন: ছিদ্রযুক্ত অণুর কারসাজি (MOF)
২০২৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিজ্ঞানী:
- সুসুমু কিতাগাওয়া (জাপান)
- রিচার্ড রবসন (অস্ট্রেলিয়া)
- ওমর ইয়াগি (আমেরিকা)
তাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOF) নামের এক অভিনব শ্রেণির উপাদান উদ্ভাবন করার জন্য।
পরিবেশ রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি
এই বিজ্ঞানীরা এমন আণবিক গঠন তৈরি করেছেন, যার ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থান বা ছিদ্র থাকে। সেই ফাঁকা জায়গাগুলোর মধ্য দিয়ে গ্যাস বা তরল পদার্থ সহজেই প্রবাহিত হতে পারে। এই কাঠামোর সুবিধাগুলো হলো:
- মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণ করা সম্ভব।
- বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে রাখা যায়।
- বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ ও রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা সহজ হয়।
এই কাঠামোর ভেতরে ধাতব আয়নগুলো “কর্নার স্টোনের” মতো কাজ করে, আর লম্বা অর্গানিক অণুগুলো সেগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে এক ধরনের ছিদ্রযুক্ত স্ফটিক গঠন তৈরি করে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো এর উপাদান বদলে নির্দিষ্ট কাজের জন্য উপযোগী MOF তৈরি করতে পারেন।
নোবেল কমিটির চেয়ার হেইনার লিঙ্কে মন্তব্য করেছেন,
“এই প্রযুক্তি এমন সব উপাদান তৈরির পথ খুলে দিয়েছে, যেগুলো আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি। এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, আধুনিক রসায়ন শুধু তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি সুপেয় পানির সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাস্তব সমস্যার মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান দিতে পারে।”
বিজ্ঞানের সমন্বিত অগ্রযাত্রা
সবশেষে বলা যায়, ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বিজ্ঞানের অগ্রগতি কখনো একক পথে চলে না। কোথাও সেটা মানবদেহের ভেতরের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বোঝায়, কোথাও বৃহৎ জগতের মধ্যে কোয়ান্টামের অদ্ভুত নিয়ম খুঁজে পায়, আবার কোথাও নতুন উপাদান তৈরি করে।
গভীর অনুসন্ধান এবং মৌলিক প্রশ্ন করার সাহসই বিজ্ঞানের আসল চালিকাশক্তি। মানব সভ্যতার সামনে যে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো অপেক্ষা করছে, সেগুলোর সমাধানের পথ এভাবেই বিজ্ঞানের হাত ধরে তৈরি হচ্ছে।
