আজকের পৃথিবীতে অর্থনীতির আসল সম্পদ শুধু জমি, খনিজ সম্পদ, শিল্প-কারখানা বা শ্রম নয়। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো জ্ঞান, উদ্ভাবন আর ঐতিহ্য। এই মেধা সম্পদের নামই ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা আইপি (Intellectual Property)।
বিভিন্ন ধরনের মেধা সম্পদের সুরক্ষার জন্য আলাদা আলাদা আইপি রয়েছে। যেমন ধরুন:
- পেটেন্ট: নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সুরক্ষা দেয়।
- ট্রেডমার্ক: একটি ব্র্যান্ডের মর্যাদা বাড়ায়।
- কপিরাইট: শিল্পী ও লেখকের সৃজনশীলতাকে রক্ষা করে।
- জিআই (GI): আঞ্চলিক পণ্যের ঐতিহ্যকে বিশ্ববাজারে আলাদা পরিচয় দেয়।
- প্ল্যান্ট ব্রিডার্স রাইটস: কৃষিক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে।
যেসব দেশ এসব আইপি বা মেধা সম্পদকে গুরুত্ব দেয়, সেসব দেশই বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক আইপি কাঠামোতে বাংলাদেশের দুর্বলতা
অথচ বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নিদারুণভাবে পিছিয়ে আছে। তার প্রধান কারণ, আমাদের দেশের নীতি-নির্ধারকরা এখনো আইপিকে উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখেন না। এছাড়া সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো আমরা এখনো কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইপি কাঠামোর সাথে যুক্ত হই নাই।
পেটেন্ট ও ট্রেডমার্কের বাধার মুখে গবেষক ও উদ্যোক্তারা
পেটেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পেটেন্ট কোঅপারেশন ট্রিটির (PCT) সদস্য নয়। ফলে কোনো গবেষক বা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করলে সেটাকে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা করাটা কঠিন। ভারত বা চীন একই আবিষ্কার করলে একটি মাত্র পেটেন্ট এপ্লিকেশনের মাধ্যমেই তারা খুব সহজেই আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষা পেতে পারে।
ট্রেডমার্কের ক্ষেত্রেও একই দুরবস্থা। বাংলাদেশ যেহেতু মাদ্রিদ প্রোটোকলের বাইরে, তাই কোনো উদ্যোক্তা বিদেশে ব্যবসা করতে চাইলে প্রতিটি দেশে আলাদা আলাদা আবেদন করতে হয়। এতে অতিরিক্ত সময় ও খরচে পিছিয়ে পড়ে তারা। অথচ ভারত, চীন বা ভিয়েতনামের উদ্যোক্তারা একবার আবেদন করেই বহু দেশে সুরক্ষা পেয়ে যায়।
কপিরাইট ও জিআই পণ্যের সুরক্ষা সংকট
কপিরাইটের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দুর্বল। আমাদের গান, নাটক, সিনেমা বা সাহিত্যকর্ম ইউটিউব বা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সহজেই পাইরেটেড হয়। অন্যরা নিজেদের নামে চালিয়ে দিতে পারে, অথচ আমরা বৈশ্বিক কপিরাইট কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা নিতে পারি না।
জিআই বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের ক্ষেত্রেও অবস্থাটা করুণ। ঢাকার জামদানি, পদ্মার ইলিশ, বগুড়ার দই কিংবা রাজশাহীর আম সবই দেশে নিবন্ধিত হলেও আন্তর্জাতিকভাবে লিসবন এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে সুরক্ষিত নয়। সেজন্য অন্য কোনো দেশ যদি এই নামগুলো ব্যবহার করে, আমরা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি না।
অথচ ফ্রান্সের শ্যাম্পেন বা ইতালির পারমিজিয়ানো চিজ সারা বিশ্বে জিআই সুরক্ষায় অভেদ্য। ভারতের বেনারসি শাড়ি বা মাদ্রাজ ফিল্টার কফিও আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত। তাই তারা নামও পাচ্ছে, দামও পাচ্ছে।
কৃষি ও উদ্ভিদ প্রজননে আইনি সীমাবদ্ধতা
উদ্ভিদ প্রজননের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা, আমরা এখনো আমাদের দেশে প্ল্যান্ট ব্রিডার্স রাইটস আইন চালু করতে পারি নাই। ফলে আমাদের দেশের উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির ফসলের জাতকে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করাতে পারছি না। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের দেশে মেধা সম্পদের অভাব নেই।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও আগামীর পথ
বাংলাদেশে সমস্যাটা আসলে দৃষ্টিভঙ্গির। উন্নয়ন বলতে আমরা এখনো শুধু রাস্তা, ব্রিজ বা দালানকোঠা বুঝি। কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে হলে আইপি বা মেধা সম্পদকে মূল শক্তি হিসেবে ধরতে হবে।
আমাদের আইপি আইন এখনো পুরোনো, অফিস দুর্বল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা থেকে পেটেন্টে রূপান্তর হয় না। আমাদের দেশি ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত হয় না। ব্যবসায়ীরা জানেন না কীভাবে আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধন করবেন। ফলে সৃজনশীলতা বা উদ্ভাবনের আসল মূল্য বাজারে অন্যরা কুড়িয়ে নিচ্ছে। আমরা জামা বানাই, লেবেলে বিদেশি ব্র্যান্ড বসে। আমরা সস্তা শ্রম দিই, আর বহুগুণ লাভ তোলে অন্যরা। আমরা কি সারাজীবন অন্যদের জন্য ঘানি টেনে যাব?
এর সমাধান আছে। আমাদের আইপি আইন ও অফিসকে আধুনিক করতে হবে, গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে জ্ঞান হস্তান্তরের সেতু তৈরি করতে হবে, উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক ফাইলিংয়ে সহায়তা দিতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো আন্তর্জাতিক আইপি কাঠামোতে যোগ দিয়ে আমাদের উদ্ভাবন, শিল্প ও ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
আসল সার্বভৌমত্ব মানে শুধু পতাকা নয়, নিজের জ্ঞান ও ঐতিহ্যের ওপর নিজের অধিকার। যেদিন বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকরা এই সহজ সত্যটা বুঝবেন, সেদিন থেকে আমাদের দেশ শুধু শ্রমের নয়, জ্ঞানের শক্তিতেও বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে পারবে।
