১২ হাজার বছরের নীরবতা ভঙ্গ
ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বের আফার অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় রিফট অঞ্চল। এই এলাকায় বছরের পর বছর ধরে ছোটখাটো ভূকম্পন এবং আগ্নেয়-কর্মকাণ্ড দেখা গেলেও হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরি দীর্ঘ বারো হাজার বছর ধরেই নিস্তব্ধ ছিল। সেই নীরব পাহাড়ই হঠাৎ করে ভোরের আকাশ ফুঁড়ে ঘোষণা করল তার পুনর্জাগরণের।
গত রোববারের সূর্য ওঠার আগ মুহূর্তে পাহাড়ের বুক চিরে একটি প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় মানুষের ভাষায়, এটি ছিল যেন হঠাৎ করে একটি বিশাল বোমা ফাটার মতো। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় কালো ধোঁয়ায়, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগ্নেয় ছাই। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ছাইয়ের স্তম্ভ প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার উঁচুতে উঠে গিয়েছিল, যাতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় বিস্ফোরণটি কতটা তীব্র ছিল।
আফার অঞ্চল ও টেকটোনিক প্লেট
আফার অঞ্চলটি পূর্ব আফ্রিকার রিফট উপত্যকার হৃদপিণ্ড। এখানে আফ্রিকান টেকটোনিক প্লেট দুই দিকে বিছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙন বরাবরই ভূগর্ভে ম্যাগমার চলাচল সক্রিয় রয়েছে।
কিন্তু হাইলি গুব্বির মতো একটি দীর্ঘনিদ্রিত আগ্নেয়গিরি কেন বারো হাজার বছর পরে আচমকা জেগে উঠল, এটি বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয়। আগ্নেয়গিরিটি দীর্ঘদিন নিস্তব্ধ থাকলেও ভূগর্ভে চাপ বাড়ছিল। কোনো এক সময় সেই চাপ নিজের সীমার বাইরে চলে গিয়েই বিস্ফোরণের মাধ্যমে পথ খুঁজে নিয়েছে। এমন দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত সাধারণত ইঙ্গিত দেয়, ভূগর্ভে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। আর এই পরিবর্তন রিফট উপত্যকার ভবিষ্যৎ ভূতত্ত্ব বোঝার জন্য অপরিহার্য।
স্থানীয় জীবনযাত্রায় প্রভাব
অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আশপাশের গ্রামগুলোতে ছাই পড়েছে, গবাদিপশু চরানোর জমি ঢেকে গেছে ধূসর স্তরে। এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী মূলত পশুপালন নির্ভর, তাই জমিতে অতিরিক্ত ছাই পড়ে ঘাসপালা নষ্ট হলে তাদের জীবিকা সরাসরি হুমকিতে পড়বে।
বৈশ্বিক ঝুঁকি ও বিমান চলাচল
হাইলি গুব্বির বিস্ফোরণ শুধু আফার নয়, দূর দেশের আকাশেও প্রভাব ফেলেছে। ছাইয়ের মেঘ লোহিত সাগর পেরিয়ে ধীরে ধীরে আরব উপদ্বীপ এবং পাকিস্তান ও ভারতের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেক দেশের বিমানসংস্থা সতর্কতা জারি করেছে। কারণ আগ্নেয় ছাই বিমানের ইঞ্জিনে প্রবেশ করলে মারাত্মক বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। কিছু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, অনেক রুট পরিবর্তন করা হয়েছে। এটা প্রমাণ করে একটি অগ্ন্যুৎপাত কত দ্রুত বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যৎ সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণ
এই অগ্ন্যুৎপাত এখনো শেষ হয়ে গেছে এমন নিশ্চয়তা নেই। আগ্নেয়গিরি একবার জেগে উঠলে পরপর কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ মাঝেমধ্যে ছাই বা ছোট বিস্ফোরণ দেখা দেয়। এটি পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।
যে আগ্নেয়গিরি বারো হাজার বছর ধরে নিস্তব্ধ ছিল, তার আচমকা সক্রিয়তা ভবিষ্যতেও ভূকম্পন বা ছাই উদগীরনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা ঐ এলাকায় ক্রমাগত নজরদারি বাড়িয়েছেন। ম্যাগমার গতিপথ, ভূকম্পনের ঘনত্ব, ছাইয়ের রাসায়নিক উপাদান সবকিছু বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
উপসংহার
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভূপ্রকৃতি কখনও সত্যিকার অর্থে নীরব বা স্থির থাকে না। যে পাহাড় হাজার বছর ধরে শান্ত ছিল, সেও এক মুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী তার ভেতরে কী ভয়ংকর শক্তি ধারণ করে আছে। হাইলি গুব্বির এই অগ্ন্যুৎপাত শুধু ইথিওপিয়ার একটি স্থানীয় ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামনে আবারও তুলে ধরলো পৃথিবীর জীবন্ত এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল রূপ।
