মহাবিশ্বের অদৃশ্য কম্পন
মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য মানুষ বরাবরই আলোর তরঙ্গের ওপর ভরসা করেছে। অপটিক্যাল টেলিস্কোপে আমরা দেখেছি দূরের গ্যালাক্সি, নীহারিকা আর নক্ষত্রের ঝলমলে ছবি। পরে যোগ হলো রেডিও টেলিস্কোপ, যা মহাবিশ্বকে নতুন করে বোঝার সুযোগ করে দিল। এর পাশাপাশি ইনফ্রারেড, আলট্রা-ভায়োলেট, এক্স-রে কিংবা গামা-রে আমাদের এনে দিয়েছে মহাবিশ্বের অসংখ্য খবর।
কিন্তু আলো বা তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ কিংবা মহাবিশ্বের জন্মলগ্নের অন্ধকার মুহূর্ত—এসব ঘটনার খবর নিয়ে আসে ভিন্ন এক ধরনের তরঙ্গ। এটি হলো স্থান-কালের বুননের নিজস্ব সূক্ষ্ম কম্পন। মহাবিশ্বের গভীর থেকে উঠে আসা এই কম্পন আলোর বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর নাম, মহাকর্ষ তরঙ্গ বা গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ।
আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণী ও চ্যালেঞ্জ
১৯১৫ সালে সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে আলবার্ট আইনস্টাইন মহাকর্ষ তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভর আর শক্তি মহাবিশ্বকে বাঁকিয়ে দেয়, আর সেই বাঁকানো অংশ যদি প্রবলভাবে আলোড়িত হয়, তবে সেটা তরঙ্গের আকারে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু আইনস্টাইন নিজেই মনে করেছিলেন, এত সূক্ষ্ম সংকেত মানুষ কোনোদিন ধরতে পারবে না। তাঁর সন্দেহটা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গতই ছিল। কারণ, কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের দু’টি ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষে জড়ালে পৃথিবীতে তার প্রভাব হয় একটি মাত্র প্রোটনের ব্যাসের হাজার ভাগের এক ভাগের সমান। এমন অতি ক্ষুদ্র কম্পন শনাক্ত করা মানব প্রযুক্তির জন্য প্রায় অসম্ভব একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।
লাইগোর সাফল্য ও নতুন জানালা
আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণীর ঠিক একশ বছর পর সেই অসম্ভব চ্যালেঞ্জ সম্ভব হয়েছে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল আর লেজার ইন্টারফেরোমিটার দিয়ে তৈরি করা লাইগো (LIGO) ডিটেক্টর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো মহাকর্ষ তরঙ্গ সরাসরি শনাক্ত করে। সেই সংকেত এসেছিল ১.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের দুটি ব্ল্যাকহোলের ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ থেকে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ মহাবিশ্বকে মহাকর্ষ তরঙ্গের মাধ্যমে বুঝতে শুরু করল।
মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি
এই সাফল্যের পর মহাকর্ষ তরঙ্গ জ্যোতির্বিদ্যার এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা নিউট্রন তারার সংঘর্ষ থেকে ভেসে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করেন এবং সেই ঘটনার ফলে উদ্ভূত আলোর তরঙ্গও ধরতে সক্ষম হন। এর ফলে জন্ম নেয় “মাল্টি-মেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমি”।
একই ঘটনার খবর আমরা এখন আলো আর মহাকর্ষ উভয় তরঙ্গ থেকে পাচ্ছি। এর মাধ্যমে জানা গেছে:
- সোনা ও প্লাটিনামের মতো ভারী মৌল মহাবিশ্বে কীভাবে তৈরি হয়েছে।
- নিউট্রন তারার ঘনত্ব ও গঠন সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া গেছে।
বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও লিসা মিশন
আজ পৃথিবীতে একসাথে কাজ করছে তিনটি মহাকর্ষ তরঙ্গ ডিটেক্টর:
- লাইগো (LIGO): যুক্তরাষ্ট্র
- ভার্গো (Virgo): ইউরোপ
- কাগরা (KAGRA): জাপান
বৈশ্বিক এই নেটওয়ার্ক শুধু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তই করছে না, মহাকাশে ঘটনাগুলোর অবস্থানও নির্ধারণ করছে। আর সামনে আসছে মহাশূন্যভিত্তিক নতুন মহাকর্ষ তরঙ্গ ডিটেক্টর—লিসা (LISA – Laser Interferometer Space Antenna)। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ২০৩০-এর দশকে এটিকে উৎক্ষেপণ করবে। মহাকাশে ভেসে থাকা তিনটি স্যাটেলাইট লেজারের মাধ্যমে গঠন করবে এক অদৃশ্য ত্রিভুজ, যা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ কিংবা বিগ ব্যাংয়ের প্রথম প্রতিধ্বনি ধরতে সক্ষম হবে।
মাস গ্যাপ রহস্য ও নতুন প্রশ্ন
সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো এই ক্ষেত্রকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে। লাইগো-ভার্গো-কাগরার সম্মিলিত গবেষণায় সম্প্রতি এমন কিছু বস্তুর সন্ধান মিলেছে যাদের ভর রয়েছে তথাকথিত “মাস গ্যাপ”-এর ভেতর।
প্রচলিত ধারণা ছিল:
- নিউট্রন তারার ভর ২.৫ সূর্যের ভরের বেশি হয় না।
- ব্ল্যাকহোলের ভর ৫ সূর্যের ভরের কম হয় না।
কিন্তু পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে এই ২.৫ থেকে ৫ সোলার ভরের সীমার ভেতরেই কিছু অদ্ভুত বস্তু, যেগুলো না নিউট্রন তারা, না সাধারণ ব্ল্যাকহোল। এগুলোর উৎপত্তি এখনো স্পষ্ট নয়। এটি বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক আবিষ্কার: রিংডাউন ও কারের তত্ত্ব
অতি সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে (ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫) প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এবারে লাইগো-ভার্গো-কাগরায় যে ব্ল্যাকহোল মার্জারের সিগন্যাল ধরা পড়েছে, সেখানে প্রথমবার পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে পুরো প্রক্রিয়াটা।
মার্জারের পর তৈরি হওয়া নতুন ব্ল্যাকহোলের ভর দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ সূর্যের সমান। এখানেই রয় কেরের (Roy Kerr) থিওরি মিলে গেল—ব্ল্যাকহোল আসলে ভর আর ঘূর্ণন এই দুই প্যারামিটারের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা যায়। একইসঙ্গে হকিংয়ের এরিয়া থিওরেমও প্রমাণ পেল।
সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এবারে ধরা পড়েছে ব্ল্যাকহোল মার্জারের শেষ ধাপের কম্পন, যাকে বলা হয়, রিংডাউন। আগে এটি অস্পষ্ট থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো এতটাই স্বচ্ছভাবে ধরা পড়েছে যে বিজ্ঞানীরা আলাদা করে তার কম্পনমাত্রা মাপতে পেরেছেন। সেই শেষ ঝংকার নিখুঁতভাবে মিলে গেছে আইনস্টাইন, হকিং আর কেরের তত্ত্বের সঙ্গে।
উপসংহার
আলো ও রেডিও তরঙ্গ দিয়ে আমরা যতটুকু দেখেছি, মহাকর্ষ তরঙ্গ সেই সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আরও গভীরে। ব্ল্যাকহোলের অন্ধকার জগত থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন—সব স্থান থেকেই এই অদৃশ্য মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে আসছে। এ পর্যন্ত আমরা কেবল তার প্রথম সুরগুলো শুনেছি। সামনে অপেক্ষা করছে মহাজাগতিক সিম্ফনির পূর্ণাঙ্গ রূপ।
