মহাবিশ্বের বিস্ময় ও গামা-রে বার্স্ট
মহাবিশ্বের অনন্ত বিস্ময়ের মাঝে লুকিয়ে রয়েছে অজস্র অজানা রহস্য। রাতের আকাশ আমাদের কাছে শান্ত আর নীরব মনে হয়, কিন্তু এরই ভেতর ঘটে যাচ্ছে এমন সব ভয়ংকর বিস্ফোরণ, যেগুলো কয়েক সেকেন্ডেই একটি গ্যালাক্সির সমান শক্তি ছড়িয়ে দিতে পারে। এদের বলা হয়, গামা-রে বার্স্ট (GRB)।
বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে ভেবেছিলেন, GRB মানেই নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় একবারের জন্য ঘটে যাওয়া তীব্র বিকিরণ। নক্ষত্র ভেঙে পড়ে, ব্ল্যাকহোল বা নিউট্রন তারায় পরিণত হয়, আর সেই মুহূর্তেই ঘটে এই মহাবিস্ফোরণ। তারপর আবার সব শান্ত হয়ে যায়।
অদ্ভুত ঘটনা: GRB 250702B
কিন্তু ২০২৫ সালের ২ জুলাই নাসার ফার্মি স্পেস টেলিস্কোপ এক অদ্ভুত ঘটনা শনাক্ত করল। এই ঘটনা যেন আগের সব নিয়মকে ভেঙ্গে দিল। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন GRB 250702B।
প্রথমে মনে হলো, এটিও অন্য সব GRB-এর মতোই কয়েক সেকেন্ডের জন্য জ্বলে উঠবে আর নিভে যাবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই বিস্ফোরণটি পুরো একদিন ধরে বারবার ফিরে আসতে থাকল। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনা দেখে একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন।
উৎস সন্ধান ও পর্যবেক্ষণ
তীব্র আকারে গামা-রে সংকেত পাওয়া গেলেও প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না, এর উৎস কোথায়। কিন্তু পরদিন ইউরোপীয় সাদার্ন অবজারভেটরির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (VLT) তার উন্নত HAWK-I ক্যামেরা দিয়ে নির্দিষ্ট করে দেখাল, বিস্ফোরণটি ঘটেছে আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে।
পরবর্তীতে হাবল স্পেস টেলিস্কোপও সেই তথ্য নিশ্চিত করল। এই গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও মার্টিন-কারিলো নির্দ্বিধায় বলেছেন, “পঞ্চাশ বছরের GRB পর্যবেক্ষণে এরকম কিছু আর কখনো দেখা যায়নি।”
বিস্ফোরণের কারণ ও বিজ্ঞানীদের অনুমান
তাহলে কীভাবে ঘটল এই বিস্ফোরণের পুনরাবৃত্তি? বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। তবে সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যা উঠে আসছে:
- হয়তো ব্ল্যাকহোল গঠনের সময় শক্তি একাধিক ধাপে বেরিয়ে এসেছে।
- অথবা নিউট্রন তারার সঙ্গে অন্য কোনো নক্ষত্রের সংঘর্ষ থেকে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এগুলো কেবলমাত্র অনুমান। অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, GRB 250702B যেন মহাবিশ্বের নতুন কোনো গোপন সংকেত, যার অর্থ আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।
ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও গবেষণা
এবার আসি ভবিষ্যতের কথায়। এ ধরনের রহস্য উন্মোচনের জন্যই বানানো হয়েছে শক্তিশালী নতুন কিছু টেলিস্কোপ। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) ইতিমধ্যেই ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণে অভূতপূর্ব ক্ষমতা দেখাচ্ছে। কোনো গামা-রে বার্স্ট বা GRB-র পরবর্তী আলো বা আফটার গ্লো বিশ্লেষণে জেমস ওয়েব অমূল্য তথ্য দিতে পারবে।
পাশাপাশি আগামী দশকে চালু হবে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার অ্যাথেনা এক্সরে অবজারভেটরি এবং জাপান, ইউরোপ ও আমেরিকার যৌথ প্রকল্প XRISM। আশা করা যাচ্ছে, মহাকাশে স্থাপিত এসব হাইটেক টেলিস্কোপ GRB-এর উচ্চশক্তির বিকিরণ আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে।
শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্রস্তাবিত থেসিয়াস মিশন বিশেষভাবে GRB নিয়ে কাজ করবে। তখন আরো ভালো করে বোঝা যাবে, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত বিস্ফোরণ বিরল কোন ঘটনা, নাকি মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত ঘটছে।
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম গ্রাভিটি
গামা-রে বার্স্ট শুধু মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণই নয়, বরং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য এক দুর্লভ পরীক্ষাগার। বিশেষত প্রস্তাবিত লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি (LQG) তত্ত্ব যাচাই করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আগ্রহী।
ধারণা করা হয়, যদি স্থান-কাল আসলেই LQG-এর মতো ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম লুপে গঠিত হয়, তাহলে গামা-রে বিস্ফোরণ থেকে নির্গত উচ্চ-শক্তির ফোটন আর নিম্ন-শক্তির ফোটনের গতিতে অতি সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যেতে পারে। বর্তমানে মহাকাশে স্থাপিত নাসার ফার্মি টেলিস্কোপ ও স্পেনের লা পালমা দ্বীপে অবস্থিত ম্যাজিক (MAGIC) টেলিস্কোপের মতো যন্ত্র দিয়ে সেই পার্থক্য খুঁজে দেখা হচ্ছে।
এখনো কোন নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি, তবে এই পরীক্ষাগুলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম পরিস্থিতি ব্যবহার করে কোয়ান্টাম গ্রাভিটির রহস্য ধরার এক অনন্য প্রচেষ্টা।
উপসংহার
বিজ্ঞানীদের কাছে GRB তাই শুধু কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ নয়, বরং মহাকাশের এক আশ্চর্য জানালা, যার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ দেখা যায় মহাবিশ্বের জন্মমুহূর্তের মতো চরম পরিস্থিতি। ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি, নিউট্রন তারার সংঘর্ষ, ডার্ক ম্যাটারের আচরণ কিংবা কোয়ান্টাম গ্রাভিটির রহস্য—এ সবকিছুই যেন এই বিস্ফোরণের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে।
তাই GRB 250702B কেবল এক দিনের বিরল কোন মহাজাগতিক ঘটনা নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক চ্যালেঞ্জ। গামা-রে বার্স্ট নিয়ে চলমান গবেষণা মহাবিশ্বকে বোঝার ধারণাকেই হয়তো একদিন বদলে দেবে।
