শারদীয় বিষুব ও সমান দিন-রাত্রি
আজ ২২ সেপ্টেম্বর। মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে একটি বিশেষ দিন। সূর্য আজ সরাসরি বিষুবরেখার উপর অবস্থান করছে। বিষুব রেখার অবস্থান পৃথিবীর মাঝ বরাবর, অর্থাৎ শুন্য ডিগ্রি অক্ষাংশে।
সূর্যের এই বিশেষ অবস্থানের ফলে আজ পৃথিবীতে দিন এবং রাত্রির দৈর্ঘ্য হবে সমান। ইংরেজিতে এই ঘটনাকে বলে ইকুইনক্স (Equinox)। শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে, যার অর্থ হলো—সমান রাত (Equal Night)।
ঋতু পরিবর্তনের নেপথ্য কারণ
কেন এমন হয়? পৃথিবী তার নিজের অক্ষের উপর প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি কোণে হেলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। এই হেলে থাকার কারণেই বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর দুই গোলার্ধ থেকে সূর্যের আপাত অবস্থানের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। আর এটাই হচ্ছে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তনের মূল বৈজ্ঞানিক কারণ।
উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে প্রভাব
২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সূর্যের অবস্থান বিষুবরেখা থেকে আরো দক্ষিণ দিকে সরে যাবে। এর ফলে দুই গোলার্ধে দুই ভিন্ন ঋতুর সূচনা হবে:
- দক্ষিণ গোলার্ধ: সেখানে শীত শেষ হয়ে বসন্তকালের সূচনা হবে। অস্ট্রেলিয়ার বৃক্ষ শিখরে এখন বসন্তের আগমনী বার্তা শোনা যাচ্ছে।
- উত্তর গোলার্ধ: এখানে গ্রীষ্মের পর এসেছে শরৎকাল। কিছুদিন পরই শুরু হবে পাতা ঝরার দিন। উত্তর আমেরিকায় একে বলে, ফল সিজন (Fall Season)। পাতা ঝরে পড়ার আগে পর্ণমোচী উদ্ভিদের পত্রপল্লব বর্ণিল হয়ে উঠে, যা এক ভারী সুন্দর দৃশ্য। এরপর উত্তর গোলার্ধে শীতের সূচনা হবে।
সূর্যের দক্ষিণায়ন ও মকরক্রান্তি
সূর্য যখন দক্ষিণে সরে যেতে থাকে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধে শুরু হয় গ্রীষ্মের খরতাপ। সূর্যের এই দক্ষিণমুখী যাত্রা শেষ হবে ২১ ডিসেম্বর। সেদিন সূর্য বিষুব রেখার সাড়ে ২৩ ডিগ্রি দক্ষিণে, মকরক্রান্তি (Tropic of Capricorn) রেখায় অবস্থান করবে।
সেই দিন দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য হবে সবচেয়ে বেশি, কিন্তু উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য হবে সবচেয়ে কম। তারপর আবার শুরু হবে সূর্যের উল্টোরথ বা উত্তরমুখী যাত্রা।
বসন্ত বিষুব ও উত্তরায়ন
বছরে দু’বার ইকুইনক্স হয়। উত্তরমুখী যাত্রায় সূর্য আবার বিষুবরেখার সরাসরি উপরে চলে আসবে ২১ মার্চ। তখন আবারও দিন-রাত্রি সমান হবে। একে বলা হয় বসন্ত বিষুব বা ভার্নাল ইকুইনক্স।
তারপর সূর্য আস্তে আস্তে সরে যাবে আরো উত্তর দিকে। তার ফলে:
- উত্তর গোলার্ধে: শীতের পর সূচনা হবে বসন্তকালের, তারপর আসবে গ্রীষ্মকাল।
- দক্ষিণ গোলার্ধে: শরতের পর আসবে শীতকাল।
সূর্যের উত্তরমুখী যাত্রা শেষ হবে ২১ জুন। সেদিন সূর্য বিষুব রেখার সাড়ে ২৩ ডিগ্রি উত্তরে, কর্কটক্রান্তি রেখায় (Tropic of Cancer) এসে পৌঁছাবে। সেই দিন উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য হবে সবচেয়ে বড়, আর দক্ষিণে সবচেয়ে ছোট।
অনন্ত আবর্তন ও কুমিল্লার ভৌগলিক গুরুত্ব
এভাবেই অনাদিকাল ধরে সৌরকেন্দ্রিক পথ পরিক্রমায় পৃথিবীর উত্তর এবং দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যের আসা-যাওয়া চলছে। এর ফলেই পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তিত হয় এবং দুই গোলার্ধে বিপরীত আবহাওয়া বিরাজ করে।
এখানে একটি বিশেষ তথ্য জানিয়ে রাখি, সূর্যের উত্তরায়নের শেষ সীমা বা কর্কটক্রান্তি রেখা বাংলাদেশের কুমিল্লা শহরের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। ভৌগলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রেখাটিকে চিহ্নিত করার জন্য কোনো সরকারি উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি, যা পর্যটন ও ভূগোলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শিক্ষণীয় স্থান হতে পারতো।
