ব্ল্যাকহোলের আদি ধারণা
অষ্টাদশ শতাব্দীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে জন মিচেল নামে একজন অধ্যাপক ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম ব্ল্যাকহোলের প্রাথমিক ধারণাটি দিয়েছিলেন। ১৭৮৩ সালে জন মিচেল বলেছিলেন, মহাবিশ্বে এমন অনেক নক্ষত্র থাকা সম্ভব যাদের এসকেপ ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগ আলোর গতির চেয়েও অনেক বেশি।
সেজন্য ওইসব নক্ষত্র থেকে কখনোই কোন আলোকরশ্মি বের হতে পারে না। এর ফলে সে সব নক্ষত্রকে আমরা কখনোই দেখতে পাই না। তিনি ঐ সব অদৃশ্য নক্ষত্রের নাম দিয়েছিলেন “ডার্ক স্টার”। তিনি অবশ্য এদের গঠনের কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেননি। কারণ সে যুগে বিজ্ঞান এতদূর অগ্রসর হয়নি। বর্তমান যুগে এসে এসব অদৃশ্য নক্ষত্রের নাম হয়েছে ব্ল্যাকহোল। ১৯৬৭ সালে এই নামটি দিয়েছিলেন জন হুইলার নামে একজন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী।
নক্ষত্রের জীবনচক্র ও জন্মরহস্য
ব্ল্যাকহোল সৃষ্টির পেছনে মহাকর্ষ বলের প্রধান ভূমিকা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মহাকর্ষ বলকে অন্যান্য বলের তুলনায় দূর্বল মনে হলেও মহাবিশ্বে এর প্রভাব সর্বব্যাপী। এর কারণ হলো দুটো: ১. মহাকর্ষ বল অনেক দূর থেকে কাজ করতে পারে। ২. মহাকর্ষ বল হলো আকর্ষণধর্মী।
মহাবিশ্বে নক্ষত্র সৃষ্টির মূলে রয়েছে এই মহাকর্ষ বল। হাইড্রোজেন গ্যাস মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পুঞ্জিভূত হয়ে নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন পরমাণুর পরস্পরের সংঘর্ষের ফলে থার্মোনিউক্লিয়ার ফিউশন (Fusion) প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তির উদ্ভব হয় এবং নক্ষত্রটি তখন প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে।
নক্ষত্রের মৃত্যু ও লোহিত দানব
একটি নক্ষত্র দীর্ঘদিন জ্বলার পর এক সময় তার হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে থাকে। হিলিয়াম পরমাণুও আস্তে আস্তে আরো ভারী পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়। ধীরে ধীরে নক্ষত্রের কেন্দ্রে আয়রনের মত ভারী পরমাণুর সৃষ্টি হয়।
এই সময় নক্ষত্রটির আয়তন অনেক বৃদ্ধি পায়। এটি তখন একটি বিশাল লোহিত দানব (Red Giant) নক্ষত্রে পরিণত হয়। নক্ষত্রটি তখনও প্রজ্জ্বলিত থাকে, কিন্তু এর উত্তাপ কমে যায়। তারপর আস্তে আস্তে নক্ষত্রটির জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন সেটা সংকুচিত হতে হতে একটি শ্বেত বামন (White Dwarf) নক্ষত্রে রূপান্তরিত হয়। সাধারণত এভাবেই একটি নক্ষত্রের জীবনাবসান হয়।
চন্দ্রশেখর সীমা ও সুপারনোভা
কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে নক্ষত্রের জীবনাবসান প্রক্রিয়াটি অন্যভাবেও হতে পারে। এ নিয়ে গবেষণা করে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর। তিনি জানতেন নক্ষত্রের ভেতরে ইলেকট্রনের চাপ এবং নক্ষত্রের নিজস্ব মহাকর্ষ বল—এ দুয়ের মাঝে একটি ভারসাম্য রয়েছে। এই ভারসাম্য থাকার ফলেই শ্বেত বামন নক্ষত্রটি মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ধ্বংস (collapse) হয়ে যায় না।
চন্দ্রশেখর বললেন, এই ভারসাম্যটি নির্ভর করে নক্ষত্রটির ভরের উপর। তিনি অংক কষে বের করলেন, শ্বেত বামন নক্ষত্রের সর্বোচ্চ ভরসীমা হলো সৌরভরের ১.৪৪ গুন। তার মানে হলো, কোন শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের চাইতে ১.৪৪ গুন অথবা তারচেয়ে বেশি হয় তবে সেটি আর শ্বেত বামন নক্ষত্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না।
তখন নক্ষত্রটি বিস্ফোরিত হবে। একে বলা হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ। বিস্ফোরিত নক্ষত্রটি এরপর দুইটি অবস্থার একটিতে পরিণত হতে পারে:
- একটি নিউট্রন নক্ষত্রে রূপান্তরিত হতে পারে।
- অথবা প্রবল মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এটি একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে।
নিউট্রন নক্ষত্র ও পালসার
নিউট্রন নক্ষত্র গঠিত হয় শুধুই নিউট্রন কণা দিয়ে। এদের পরিধি মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার, কিন্তু এদের ঘনত্ব অস্বাভাবিক বেশি। কিছু কিছু নিউট্রন নক্ষত্র রয়েছে যেগুলো তার নিজের অক্ষের উপর প্রচন্ড গতিতে ঘুরপাক খায়। এই ঘূর্ণির ফলে সেগুলো থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর রেডিও সিগন্যাল বের হয়। এই রেডিও সিগন্যাল দিয়ে নিউট্রন নক্ষত্রগুলোকে শনাক্ত করা যায়। বিজ্ঞানীরা এদের নাম দিয়েছেন, পালসার।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও স্থান-কাল
মহাবিশ্বে ব্ল্যাকহোল এক অত্যন্ত বিস্ময়কর বস্তু। একে বুঝতে হলে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব সম্বন্ধে কিছুটা জানতে হবে। আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্বে স্থান এবং কাল একই সূত্রে গাঁথা। আইনস্টাইন বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে স্থান এবং কালের যৌথ বুননেই মহাবিশ্বের অবকাঠামো গঠিত হয়েছে। একে বলা হয় স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল।
বস্তুর উপস্থিতির জন্য স্থান-কালের চাদরে এক ধরনের কার্ভেচার বা বক্রতার সৃষ্টি হয়। এই বক্রতাটিকেই আমরা মহাকর্ষ বল হিসেবে দেখি। যেমন, সূর্যের উপস্থিতির জন্য তার চারপাশে স্থান-কালের চাদরের মাঝে যে বক্রতাটির সৃষ্টি হয়েছে সেটিকে অনুসরণ করেই পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। আইনস্টাইনের মতে, বস্তুর মহাকর্ষ বল হলো স্থান-কালের চাদরের বক্রতারই বহিঃপ্রকাশ।
সিঙ্গুলারিটি ও ইভেন্ট হরাইজন
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রবল মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ব্ল্যাকহোলের অভ্যন্তরে স্থান-কালের চাদরের বক্রতাটি অসীম আকার ধারণ করেছে। এর নাম তাঁরা দিয়েছেন, সিঙ্গুলারিটি। এখানে এসে স্থান এবং কাল একাকার হয়ে গেছে এবং সময় গেছে থেমে।
ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ বল হলো সর্বগ্রাসী। এর কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে, যেটা একবার অতিক্রম করলে সেখান থেকে ফেরার আর কোনো উপায় থাকে না। এই সীমার ভেতরে যে কোনো বস্তুকেই ব্ল্যাকহোল গ্রাস করে নেয়। এই সীমারেখাটির নাম হলো, ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা-দিগন্ত। প্রবল মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ব্ল্যাকহোলের ভেতর থেকে কোন সিগন্যালই বের হতে পারে না, তাই একে শনাক্ত করতে হয় ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে থেকে।
ব্ল্যাকহোলের প্রথম ছবি ও প্রমাণ
মজার ব্যাপার হলো, ১৯১৯ সালে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রমানিত হওয়ার ঠিক একশ বছর পর, ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁরা একটি ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
ব্ল্যাকহোল থেকে আলো বের হতে না পারলেও, বিজ্ঞানীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা আটটি ইভেন্ট হরাইজন রেডিও টেলিস্কোপের ডেটা বিশ্লেষণ করে এই অসাধ্য সাধন করেন। এই পদ্ধতিকে বলে, ভেরি লং বেইজলাইন ইন্টারফেরোমেট্রি (VLBI)। ছবিতে দেখা যায়, প্রবল মহাকর্ষের প্রভাবে ইভেন্ট হরাইজনের বাইরের আলো ব্ল্যাকহোলের দিকে বেঁকে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক ছবিটির মাধ্যমে একশ বছরের ব্যবধানে আবারও প্রমাণিত হলো মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কালজয়ী তত্ত্ব।
আমাদের গ্যালাক্সির সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল
দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই রয়েছে বিশাল আকৃতির ব্ল্যাকহোল। আমাদের নিজস্ব মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও রয়েছে এরকম একটি সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল, যার ভর ৪.৫ মিলিয়ন সৌরভরের সমান। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন, “স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার”। এটি আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালে এন্ড্রিয়া গেজ এবং রেইনহার্ড গেনজেল পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
সম্প্রতি (২৭ মার্চ, ২০২৪) ইউরোপিয়ান সাদার্ণ অবজারভেটরি “স্যাজিটেরিয়াস এ স্টারের” একটি নতুন ছবি প্রকাশ করেছে, যা তোলা হয়েছে পোলারাইজড আলো ব্যবহার করে। এই ছবিতে ব্ল্যাকহোলের ম্যাগনেটিক ফিল্ড লাইনগুলো সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
হকিং রেডিয়েশন ও উপসংহার
ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন, ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের সীমানায় এক ধরনের বিকিরণ হয়। অত্যন্ত কম তাপমাত্রার এই বিকিরণকে বলা হয়, হকিং রেডিয়েশন।
কোয়ান্টাম শূন্যতার মাঝে যেসব ভার্চুয়াল কণা এবং প্রতিকণার উদ্ভব হয় তারই কিছুটা হকিং রেডিয়েশন হিসেবে ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। এর ফলে ব্ল্যাকহোল ধীরে ধীরে তার ভর হারায়। হকিং রেডিয়েশনকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে যে সম্ভব হবে না, সেটা বলা যায় না। আশা করা যায়, আগামী বছরগুলোতে বিজ্ঞানীদের কাছে ব্ল্যাকহোলের আরো অনেক রহস্যই উন্মোচিত হবে।
