Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানসাদা-কালো যমজ বোন: মিলি ও মার্সিয়ার জেনেটিক রহস্য

সাদা-কালো যমজ বোন: মিলি ও মার্সিয়ার জেনেটিক রহস্য

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বিস্ময়কর প্রচ্ছদ

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের এপ্রিল ২০১৮ সংখ্যার প্রচ্ছদে দুটি মেয়ের ছবি ছাপা হয়েছিল, যা সারা বিশ্বকে চমকে দেয়। ওদের একজনের নাম মিলি আর অন্যজনের নাম মার্সিয়া। মিলি হলো কৃষ্ণাঙ্গ আর মার্সিয়া শ্বেতাঙ্গ।

মজার ব্যাপার হলো, ওরা দুজন আপন বোন। শুধু আপন বোনই নয়, ওরা দুজন যমজ বোন। এরকম সাদা-কালো যমজ বোন সচরাচর দেখা যায় না।

জন্ম রহস্য: নন-আইডেন্টিকাল টুইন

ওদের বাবা কৃষ্ণাঙ্গ আর মা শ্বেতাঙ্গ। আর ওরা হলো ‘নন-আইডেন্টিকাল টুইন’ বা ভিন্ন ডিম্বজ যমজ। তারমানে যমজ হলেও ওদের জন্ম হয়েছে মায়ের গর্ভে দুইটি ভিন্ন ডিম্বাণু থেকে।

বাবার শুক্রাণু দুইটি ডিম্বাণুকে পৃথক পৃথক ভাবে নিষিক্ত করেছিল। যার একটি থেকে জন্ম নিয়েছে মিলি আর অন্যটি থেকে জন্ম নিয়েছে মার্সিয়া। আর জেনেটিক কারণে:

  • একজন পেয়েছে বাবার ত্বকের বৈশিষ্ট্য (কৃষ্ণাঙ্গ)।
  • অন্যজন পেয়েছে মায়ের ত্বকের বৈশিষ্ট্য (শ্বেতাঙ্গ)।

ত্বকের রঙ ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, মানুষের গায়ের রঙের জন্য মাত্র কয়েকটি জিন দায়ী। এই জিনগুলি মানুষের ত্বকের ‘মেলানিন’ নামের প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

  • মানুষের ত্বকে মেলানিনের আধিক্য থাকলে ত্বকের রং হয় কালো।
  • মেলানিন কম থাকলে ত্বকের রং হয় সাদা।

তবে শুধু সাদা বা কালো নয়, এদের মাঝামাঝি আরো অনেক বর্ণের মানুষ রয়েছে, যেমন—পীত, বাদামী ইত্যাদি।

মানব ইতিহাস ও জিনের বিবর্তন

বিজ্ঞানীরা ফসিল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে আদি মানবের উদ্ভব হয়েছিল আফ্রিকাতে। তখন সব মানুষই ছিলো কৃষ্ণবর্ণ। তারপর এই আদি মানবদের একদল আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে এসে ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজার বছরের পরিক্রমায় পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে মিউটেশনের ফলে মানুষের ত্বকের জিনের পরিবর্তন হয় এবং বিভিন্ন বর্ণের মানুষের উদ্ভব ঘটে। তবে মানব জিনোমের বিশালত্বের কাছে ত্বকের রঙের এই জেনেটিক পরিবর্তনটি অতি তুচ্ছ ও নগন্য।

বর্ণবাদ বনাম বাস্তবতা

অথচ এই অতি সামান্য জেনেটিক পরিবর্তনটি মানবসমাজে বর্ণবাদের মতো ভয়াবহ প্রথার জন্ম দিয়েছে, যার কুপ্রভাব থেকে মানুষ এখনো মুক্ত হতে পারেনি। পৃথিবীর অনেক সমাজে এখনো বর্ণবাদ প্রকাশ্যে অথবা অপ্রকাশ্যে বিরাজমান।

এখনো অনেক সমাজে সাদাকে কালোর চেয়ে উন্নত মনে করা হয় এবং কালো মানুষকে বঞ্চিত করে রাখা হয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে। মানুষ প্রায়শই ভুলে যায় যে কালো আর সাদা শুধুই বাহ্যিক আবরণ মাত্র। সকল বর্ণের মানুষই আসলে সমান, একই ধরিত্রীর সন্তান। মিলি আর মার্সিয়া, এই দুই সাদা-কালো যমজ বোন যেন সেই অমোঘ সত্যেরই জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular