Wednesday, January 14, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeনোবেল পুরষ্কারআহমেদ হাসান জিওয়ালী: ফেমটোকেমিস্ট্রির জনক ও নোবেলজয়ী

আহমেদ হাসান জিওয়ালী: ফেমটোকেমিস্ট্রির জনক ও নোবেলজয়ী

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

জন্মসূত্রে আহমেদ হাসান জিওয়ালী ছিলেন মিশরীয়। ১৯৪৬ সালে মিশরের এক অতি সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে অনার্স এবং মাস্টার্স করার পর তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। তারপর কয়েক বছর ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে গবেষণা করার পর ফ্যাকাল্টি হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (Caltech) যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি স্থায়ীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনায় বসবাস করতেন। এই ক্যালটেক থেকেই তিনি ফেমটোকেমিস্ট্রি নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

রাসায়নিক বিক্রিয়া ও সময়ের চ্যালেঞ্জ

বিজ্ঞানীরা জানেন, বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় পদার্থের আণবিক গঠনের পরিবর্তন ঘটে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। সময়ের হিসেবে এসব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে ফেমটো সেকেন্ডের ব্যবধানে।

এক ফেমটো সেকেন্ড (১০^-১৫) হলো এক ন্যানোসেকেন্ডের (১০^-৯) এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ মাত্র। এই অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সময়ের মধ্যে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি-প্রকৃতিকে অনুসরণ করা বা পর্যবেক্ষণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য ছিল একটি দুঃসাধ্য কাজ।

ফেমটোসেকেন্ড স্পেক্ট্রোস্কপি: এক যুগান্তকারী আবিষ্কার

আহমেদ হাসান জিওয়ালী এই দুঃসাধ্য কাজটি করেছিলেন তাঁর আবিষ্কৃত ফেমটো সেকেন্ড স্পেক্ট্রোস্কপির মাধ্যমে। এর জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন আল্ট্রা ফাস্ট লেজার রশ্মি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ফেমটো সেকেন্ডের ব্যবধানে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।

তাঁর এই আবিষ্কারটির ফলে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় পরমাণুর স্থানান্তর এবং নুতন কেমিক্যাল বন্ড গঠনের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা অনেক নতুন তথ্য পেয়েছেন। এটি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই অসামান্য অবদানের জন্যই তাঁকে ১৯৯৯ সালে এককভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর এই আবিষ্কারটির সুদুরপ্রসারি সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্মাননা ও আন্তর্জাতিক অবদান

বিজ্ঞানে অবদানের পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিলেন অত্যন্ত সমাদৃত। যেই বছর তিনি নোবেল পান, সেই একই বছর তাঁর মাতৃভূমি মিশর তাঁকে সে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, ‘গ্র্যান্ড কলার অফ দি নাইল’-এ ভূষিত করে।

পরবর্তীতে তাঁর অর্জনের ঝুলিতে যুক্ত হয় আরও অনেক সম্মাননা:

  • ২০০৬ সালে তাঁকে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন ওয়ার্ল্ড এওয়ার্ড অফ সাইন্স প্রদান করা হয়।
  • তিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একজন বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে তিনি মিশর, জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক প্রভৃতি মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে সফর করেন এবং সহায়তা প্রদান করেন।

জীবনাবসান

বিজ্ঞানের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০১৬ সালের ২ আগস্ট পরলোকগমন করেন। তিনি চলে গেলেও ফেমটোকেমিস্ট্রির জগতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular