Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

সবুজ বিপ্লব

ষাটের দশকে পৃথিবীতে দুটো যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। এ দুটো ঘটনার ফলে পৃথিবীর অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে  বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়। অনেকে এটাকে বলেন “সবুজ বিপ্লব” বা Green Revolution, কিন্তু আসলে ঠিক কি ঘটেছিল সেই সময়? চলুন ফিরে যাই পঞ্চাশ বছর আগে। দেখে আসি ঘটনা দুটো।

সেই সময় আন্তর্জাতিক গম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা  মেক্সিকোতে বসে কাজ করছিলেন গমের ফলন বাড়াতে। তাঁরা দেখলেন গমের গাছ গুলো বড্ড বেশি লম্বা। ফলন বাড়ানোর জন্য সার দিলে গাছ গুলো নুয়ে পড়ে। এতে হিতে বিপরীত হয়। ফসল তোলাটাই তখন সমস্যা  হয়ে  দাঁড়ায়। ফলন কমে যায় । তাঁরা ঠিক  করলেন খাটো জাতের গম গাছ উদ্ভাবন করতে হবে। তাহলে ফলন বেশি  হলেও গাছ দাঁড়িয়ে থাকবে।  যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। কোমর বেঁধে তাঁরা নামলেন খাটো জাতের গাছের সন্ধানে। যাকে বলে একেবারে গরু খোঁজা। গবেষণা শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে ব্যাপারটা অবশ্য তাই  দাঁড়ায়। খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়েও গেলেন  বামন জাতের সেই কাঙ্খিত গম গাছ। নাম তার ‘নোরীন দশ’ । এই জাতটি জাপানী বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছিলেন সেই ১৯৩৫ সালে। কিন্তু  দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের  ডামাডোলে এর কথা  সবাই ভুলেই  গিয়েছিলো। মাত্র দু ফুট লম্বা এ জাতটি হাতে পেয়ে আন্তর্জাতিক গম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তাঁরা ‘নোরীন দশ’ জাতটি তাঁদের ব্রিডিং প্রোগ্রামে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করলেন অনেক গুলো নতুন  উচ্চ ফলনশীল খাটো জাতের গম গাছ । যা সার দিলেও হেলে পড়েনা  বরং প্রচুর ফলন দেয়। এ নতুন  জাতের গমবীজ গুলো আমাদের উপমহাদেশে আমদানি করে চাষাবাদ শুরু করা হলো।  তাতে আশাতীত ফল ও পাওয়া গেল। গমের ফলন বেড়ে গেল বেশ কয়েকগুণ। আর  এভাবেই সবুজ বিপ্লবের সূচনা হলো। যে বিজ্ঞানীটি এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর নাম হলো ড: নরম্যান বরলোগ। ক্ষুধা মুক্তির আন্দোলনে অপরিসীম ভুমিকা রাখার জন্য ১৯৭০ সালে তাঁকে শান্তিতে নোবেল  পুরষ্কার দেয়া হয়।

এতো গেল গমের কথা । ধানের ফলন  নিয়েও তখন গবেষণা চলছিলো  ফিলিপিন্সের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রে। ধান বিজ্ঞানীদের ও একই ধরনের সমস্যা ছিল গাছের উচ্চতা নিয়ে। ধান গাছ লম্বা হলেই ফলন কমে যায়। তাঁরাও সমাধান খুঁজে পেলেন একটি খাটো জাতের ধানের মধ্যে।  চাইনিজ এই জাতটির নাম হলো ‘ডি-জী-উ জেন’।  এই জাতটির সাথে ইন্দোনেশিয়ার ‘পেটা’ নামের আরেকটি জাতের সংকরায়ণ করে  তাঁরাও উদ্ভাবন করলেন  খাটো জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান ‘আই আর ৮’ । যাকে অনেকে বলেন মিরাকেল রাইস।  আমাদের দেশে চলতি  ভাষায় যাকে বলে ইরি ধান । এই ইরি ধান চাষ করে  ধানের ফলন ও রাতারাতি কয়েক গুন বেড়ে গেল। যদিও ধান বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি, কিন্তু ক্ষুধা মুক্তির সংগ্রামে  তাঁদের অবদান ও গম বিজ্ঞানীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

এভাবেই ষাটের দশকে গম ও ধানের ক্ষেত্রে দুটো যুগান্তকারী ঘটনা মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করেছিলো ।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments