Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশসবুজ বিপ্লব: গম ও ধানের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস

সবুজ বিপ্লব: গম ও ধানের কৃষি বিপ্লবের ইতিহাস

ষাটের দশক ও কৃষি সংকট

ষাট বছর আগে, অর্থাৎ গত শতাব্দীর ষাটের দশকে পৃথিবীতে দুটো যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। এই দুটো ঘটনার ফলে পৃথিবীর অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। অনেকে এটাকে বলেন “সবুজ বিপ্লব” বা Green Revolution। কিন্তু আসলে ঠিক কি ঘটেছিল সেই সময়? চলুন ফিরে যাই পঞ্চাশ বছর আগে এবং দেখে আসি সেই ঐতিহাসিক ঘটনা দুটো।

মেক্সিকোর গম গবেষণা ও নরম্যান বরলোগ

সেই সময় আন্তর্জাতিক গম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা মেক্সিকোতে বসে কাজ করছিলেন গমের ফলন বাড়াতে। তাঁরা দেখলেন গমের গাছগুলো বড্ড বেশি লম্বা। ফলন বাড়ানোর জন্য জমিতে সার দিলে গাছগুলো নুয়ে পড়ে। এতে হিতে বিপরীত হয়। ফসল তোলাটাই তখন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এবং ফলন কমে যায়।

তাঁরা ঠিক করলেন খাটো জাতের গম গাছ উদ্ভাবন করতে হবে। তাহলে ফলন বেশি হলেও গাছ খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। কোমর বেঁধে তাঁরা নামলেন খাটো জাতের গাছের সন্ধানে। যাকে বলে একেবারে ‘গরু খোঁজা’। গবেষণা শব্দটির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে (গো+এষণা) ব্যাপারটা অবশ্য তাই দাঁড়ায়।

নোরীন দশ: এক জাদুকরী ভ্যারাইটি

খুঁজতে খুঁজতে একদিন তাঁরা পেয়েও গেলেন বামন জাতের সেই কাঙ্খিত গম গাছ। নাম তার ‘নোরীন দশ’। এই জাতটি জাপানী বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছিলেন সেই ১৯৩৫ সালে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলে এর কথা সবাই ভুলেই গিয়েছিল। মাত্র দু’ফুট লম্বা এ জাতটি হাতে পেয়ে আন্তর্জাতিক গম গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন।

তাঁরা ‘নোরীন দশ’ জাতটি তাঁদের ব্রিডিং প্রোগ্রামে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করলেন অনেকগুলো নতুন উচ্চ ফলনশীল খাটো জাতের গম গাছ। যা জমিতে সার দিলেও হেলে পড়েনা বরং প্রচুর ফলন দেয়। এই নতুন জাতের গমবীজগুলো আমাদের উপমহাদেশে আমদানি করে চাষাবাদ শুরু করা হলো। তাতে আশাতীত ফলও পাওয়া গেল। গমের ফলন বেড়ে গেল বেশ কয়েকগুণ। আর এভাবেই সবুজ বিপ্লব-এর সূচনা হলো।

যে বিজ্ঞানীটি এই কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর নাম হলো ড: নরম্যান বরলোগ। ক্ষুধা মুক্তির আন্দোলনে অপরিসীম ভুমিকা রাখার জন্য ১৯৭০ সালে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়।

ধান গবেষণা ও মিরাকেল রাইস

এতো গেল গমের কথা। ধানের ফলন নিয়েও তখন গবেষণা চলছিলো ফিলিপিন্সের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রে (IRRI)। ধান বিজ্ঞানীদেরও একই ধরনের সমস্যা ছিল গাছের উচ্চতা নিয়ে। ধান গাছ লম্বা হলেই ফলন কমে যায়, বাতাসে হেলে পড়ে।

তাঁরাও এর সমাধান খুঁজে পেলেন একটি খাটো জাতের ধানের মধ্যে। চাইনিজ এই জাতটির নাম হলো ‘ডি-জী-উ জেন’। এই জাতটির সাথে ইন্দোনেশিয়ার ‘পেটা’ নামের আরেকটি জাতের সংকরায়ণ করে তাঁরাও উদ্ভাবন করলেন খাটো জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান ‘আই আর ৮’ (IR8)।

ইরি ধান ও খাদ্য নিরাপত্তা

এই ‘আই আর ৮’ ধানকে অনেকে বলেন ‘মিরাকেল রাইস’। আমাদের দেশে চলতি ভাষায় একে বলা হয় ‘ইরি ধান’। এই ইরি ধান চাষ করে ধানের ফলনও রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। যদিও ধান বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি, কিন্তু ক্ষুধা মুক্তির সংগ্রামে তাঁদের অবদানও গম বিজ্ঞানীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

এভাবেই ষাটের দশকে গম ও ধানের ক্ষেত্রে এই দুটো যুগান্তকারী ঘটনা মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করেছিল, যা ইতিহাসে সবুজ বিপ্লব নামে অমর হয়ে আছে।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular