Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানজিনোম সিকোয়েন্স ও জীবন রহস্য

জিনোম সিকোয়েন্স ও জীবন রহস্য

আজকাল বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা খুললে দেখা যায় বিজ্ঞানীরা সংবাদ সম্মেলন করে ইলিশ মাছ, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীর “জীবনরহস্য” উন্মোচন করার ঘোষণা দিচ্ছেন। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে, পাটের জিনোম সিকোয়েন্সের মাধ্যমে। তখন বলা হয়েছিল বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা পাটের “জীবনরহস্য” উন্মোচন করেছেন। জিনোম সিকোয়েন্স করাকে বাংলায় “জীবনরহস্য” উন্মোচন বলা কতখানি যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।

আসুন জিনোম সিকোয়েন্স ব্যাপারটা কি একটু খোলাসা করে দেখা যাক। জিনোম বলতে কোন জীবের সামগ্রিক ডি এন এ (DNA) কে বোঝায়। জীবজগতের বংশগতির ধারক ও বাহক হলো ডি এন এ অণু । এর মাধ্যমেই জীবের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। ‌ ডি এন এ হলো ডি অক্সি রাইবো নিউক্লিক এসিডের সংক্ষিপ্ত নাম।

জীবকোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে ক্রোমোসমের মধ্যেই মূলত এর অবস্থান। ডি এন এ অণুগুলো বেশ বড়ো আকারের হয়। দুটো লম্বা সুতোর মতো পরস্পরকে এরা জড়িয়ে থাকে। তাদের এই জড়িয়ে থাকা কাঠামোটিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ডি এন এ ডাবল হিলিক্স। এই ডাবল হিলিক্স কাঠামোটি  তৈরী হয়েছে, ডি অক্সি রাইবোস, ফসফেট এবং চার ধরণের নাইট্রোজেন বেইস (base) দিয়ে। এই বেইস গুলোর নাম হল এডেনিন (A), থায়ামিন (T), গুয়ানিন (G) এবং সাইটোসিন (C) । এদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে চারটি অক্ষর-  ATGC দিয়ে।  ডি এন এ অণুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এই  ডাবল হিলিক্স কাঠামোটি, যার ভেতরে A  জোড় বেঁধে থাকে T  এর সাথে, আর C  জোড় বেঁধে থাকে G এর সাথে। প্রতিটি ডি এন এ অণুতে এরকম লক্ষ লক্ষ জোড়া বেইস (base pair) রয়েছে।

ডি এন এ বর্ণমালায়  রয়েছে চারটি মাত্র অক্ষর ATGC। এই  চারটি “অক্ষরের” বিন্যাসে এককোষী ব্যাকটেরিয়া সহ যাবতীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সামগ্রিক ডি এন এ বা জিনোম গঠিত হয়েছে। জিনোমের আকার নির্ভর করে বেইসের সংখ্যার উপর। মানুষের জিনোমে প্রায়  তিন বিলিয়ন বেইস পেয়ার (base pair) রয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, জিনোমের ডি এন এর পুরোটাই  জিন (gene) নয়। জিন বলতে জিনোমের সেই অংশকেই বোঝায় যা নির্দিষ্ট কোন প্রোটিন তৈরীর কোডকে ধারণ করে। আসলে জিনোমের অতি সামান্য অংশই হলো জিন। জিনোমের বেশির ভাগ অংশই হলো কোডবিহীন ডি এন এ। তাই জিনোমের ভেতর থেকে জিন গুলোকে রীতিমতো খুঁজে বের করতে হয়। আর এই খুঁজে বের করার কাজটি বেশ কঠিন‌।  অনেকটা খড়ের গাদার ভেতর থেকে সুঁই খুঁজে বের করার মত ব্যাপার। মানুষের জিনোমের তিন বিলিয়ন জোড়া বেইসের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে মাত্র ২০ হাজারের মতো জিন। এই জিন গুলো সম্মিলিত ভাবে মানবের সকল বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে।

জীব বৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে জিনের তারতম্য। ‌ কোন জীবের সমস্ত জিনকে শনাক্ত করতে হলে প্রথমে তার পুরো জিনোমকে সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। জিনোম সিকোয়েন্স মানে হলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডি এন এ অণুর ভেতর ATGC বেইস গুলো কিভাবে সাজানো আছে সেটা বের করা। এটা করা এক সময় খুব কঠিন এবং ব্যয়সাধ্য কাজ ছিল। এখন স্বয়ংক্রিয় মেশিনের সাহায্যে এটা খুব সহজেই করা যায়। আজকাল অত্যাধুনিক সিকোয়েন্সিং
মেশিনে মোটামুটি দ্রুতই জিনোম সিকোয়েন্স করা যায়। এটা অবশ্য শতভাগ নির্ভুল নয়। ডি এন এ ডাটা তে সামান্য কিছু কিছু গ্যাপ থেকেই যায়। তবুও কাজ চালানোর মতো জিনোম সিকোয়েন্স মেশিন দিয়ে করা যায়।

কিন্তু জিনোম সিকোয়েন্স করলেই কি জীবনের রহস্য জানা হয়ে গেল? ব্যাপারটা কি এতই সহজ? আগেই বলেছি জিনোমের খুব ক্ষুদ্র একটা অংশই হলো জিন। এই জিনগুলোকে শনাক্ত করার জন্য আরো কিছু কাজের প্রয়োজন রয়েছে। ‌ জিন গুলোর অবস্থান নির্ণয় করার পাশাপাশি এগুলো কি ভাবে কাজ করে, কি ধরনের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে, কিভাবে পরস্পরের সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে এসব জানাটাও জরুরী। এর জন্য আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ‌এই গবেষণার নাম হলো ফাংশনাল জিনোমিক্স। এটা অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

জিনোম সিকোয়েন্সকে “জীবনরহস্য” উন্মোচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটাই শেষ কথা নয়। এটা হল শুরু। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন সেজন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। আশা করব তাঁরা তাদের কাজ আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments