গত ২১ অক্টোবর ২০১৯, বিশ্বখ্যাত নেচার জার্নালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গবেষণায় তাঁরা জিনোম এডিটিংয়ের একেবারে নতুন এক পদ্ধতির কথা জানান, যার নাম প্রাইম এডিটিং। গবেষকরা দাবি করেন, এই নতুন প্রযুক্তি প্রচলিত ক্রিসপার ক্যাস-৯ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং কার্যকর।
আমরা জানি, মানুষের শরীরে নানান ধরনের জটিল জেনেটিক রোগ দেখা যায়, যেগুলো সাধারণত জিনের মধ্যে হওয়া মিউটেশন বা পরিবর্তনের ফল। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন এইসব পরিবর্তনকে ঠিক করে জিনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে রোগ সারানোর জন্য। এই ক্ষেত্রে ক্রিসপার ক্যাস-৯ প্রযুক্তি বড় ধরনের বিপ্লব ঘটালেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ভুল জায়গায় ডিএনএ কেটে যাওয়া, যাকে বলে অফ-টার্গেট এফেক্ট। ফলে মানুষের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিতে এমন ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা অনেক কম। গবেষণাগারে মানুষের ও ইঁদুরের কোষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিটি অনেক বেশি নির্ভুল। এমনকি তাঁরা সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং টে-স্যাকস রোগের মতো মারাত্মক জেনেটিক রোগের সংশ্লিষ্ট জিনের ত্রুটি প্রাইম এডিটিংয়ের মাধ্যমে মেরামত করতে পেরেছেন।
ক্রিসপার ক্যাস-৯ যেখানে ডিএনএ-র দুটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়, সেখানে প্রাইম এডিটিং কাটে শুধুমাত্র একটি স্ট্র্যান্ড। এই পদ্ধতিতে কোনো আলাদা ডোনার ডিএনএ ব্যবহৃত হয় না। বিজ্ঞানীরা ক্যাস-৯ প্রোটিনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন একটি রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম। এর সাথে থাকে একটি বিশেষ নির্দেশক আরএনএ, যার নাম পিইজি-আরএনএ (প্রাইম এডিটিং গাইড- আরএনএ)। এই পিইজি-আরএনএ একদিকে টার্গেট করা জিনকে চিনে ফেলে এবং অন্যদিকে জিনের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত বহন করে। টার্গেট স্পট চিহ্নিত হওয়ার পর ক্যাস-৯ প্রোটিন ডিএনএ-র একটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়। তারপর রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম সেই অংশে নতুন ডিএনএ অনুলিপি তৈরি করে বসিয়ে দেয়। ব্যাপারটা শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বাস্তবে সেটাই সম্ভব করে তুলেছেন হার্ভার্ডের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষের ডিএনএ-তে ১৭৫টির বেশি নির্ভুল এডিটিং করতে পেরেছেন। তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের শরীরের প্রায় ৮৯ শতাংশ জেনেটিক রোগের প্রতিকার সম্ভব।
২০১৯ সালের পর থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালে ব্রড ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইম এডিটিংয়ের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে, যার একটি সংস্করণের নাম, পিই-ম্যাক্স। এটি প্রাইম এডিটিংয়ের কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এই পদ্ধতিটি জীবন্ত প্রাণীর দেহেও পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জিন এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে এটা এক বিশাল অগ্রগতি।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কিছু বায়োটেক কোম্পানি প্রাইম এডিটিং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে মানুষের উপর পরীক্ষামূলক চিকিৎসা শুরু করেছে। বিশেষ করে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, লিভারের জিনগত সমস্যা এবং চোখের রেটিনার জটিলতাগুলোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধাপের গবেষণা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল গবেষকদের আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ এর নিরাপত্তা ভালো এবং অফ-টার্গেট প্রায় নেই বললেই চলে।
যদিও এখনো ব্যাপকভাবে মানবদেহে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়নি, তবে প্রাথমিক ফলাফল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। মনে রাখতে হবে, প্রাইম এডিটিং এখনো একটি নতুন প্রযুক্তি। এটি নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো প্রয়োজন। তবে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই হয়তো আমরা জেনেটিক রোগ থেকে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাব। হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন ডাক্তাররা কেবল নির্ভুল জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমেই মানুষের কঠিন রোগ সারিয়ে তুলবেন, কোনো ছুরি-কাঁচির সাহায্য ছাড়াই।

