Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানপ্রাইম এডিটিং: জিনোম এডিটিংয়ের নতুন দিগন্ত

প্রাইম এডিটিং: জিনোম এডিটিংয়ের নতুন দিগন্ত

গত ২১ অক্টোবর ২০১৯, বিশ্বখ্যাত নেচার জার্নালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই গবেষণায় তাঁরা জিনোম এডিটিংয়ের একেবারে নতুন এক পদ্ধতির কথা জানান, যার নাম প্রাইম এডিটিং। গবেষকরা দাবি করেন, এই নতুন প্রযুক্তি প্রচলিত ক্রিসপার ক্যাস-৯ পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং কার্যকর।
আমরা জানি, মানুষের শরীরে নানান ধরনের জটিল জেনেটিক রোগ দেখা যায়, যেগুলো সাধারণত জিনের মধ্যে হওয়া মিউটেশন বা পরিবর্তনের ফল। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন এইসব পরিবর্তনকে ঠিক করে জিনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনে রোগ সারানোর জন্য। এই ক্ষেত্রে ক্রিসপার ক্যাস-৯ প্রযুক্তি বড় ধরনের বিপ্লব ঘটালেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ভুল জায়গায় ডিএনএ কেটে যাওয়া, যাকে বলে অফ-টার্গেট এফেক্ট। ফলে মানুষের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিতে এমন ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা অনেক কম। গবেষণাগারে মানুষের ও ইঁদুরের কোষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, প্রাইম এডিটিং পদ্ধতিটি অনেক বেশি নির্ভুল। এমনকি তাঁরা সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং টে-স্যাকস রোগের মতো মারাত্মক জেনেটিক রোগের সংশ্লিষ্ট জিনের ত্রুটি প্রাইম এডিটিংয়ের মাধ্যমে মেরামত করতে পেরেছেন।
ক্রিসপার ক্যাস-৯ যেখানে ডিএনএ-র দুটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়, সেখানে প্রাইম এডিটিং কাটে শুধুমাত্র একটি স্ট্র্যান্ড। এই পদ্ধতিতে  কোনো আলাদা ডোনার ডিএনএ ব্যবহৃত হয় না। বিজ্ঞানীরা ক্যাস-৯ প্রোটিনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন একটি রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম। এর সাথে থাকে একটি বিশেষ নির্দেশক আরএনএ, যার নাম পিইজি-আরএনএ (প্রাইম এডিটিং গাইড- আরএনএ)। এই পিইজি-আরএনএ একদিকে টার্গেট করা জিনকে চিনে ফেলে এবং অন্যদিকে জিনের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত বহন করে। টার্গেট স্পট চিহ্নিত হওয়ার পর ক্যাস-৯ প্রোটিন ডিএনএ-র একটি স্ট্র্যান্ড কেটে দেয়। তারপর রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম সেই অংশে নতুন ডিএনএ অনুলিপি তৈরি করে বসিয়ে দেয়। ব্যাপারটা শুনতে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বাস্তবে সেটাই সম্ভব করে তুলেছেন হার্ভার্ডের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষের ডিএনএ-তে ১৭৫টির বেশি নির্ভুল এডিটিং করতে পেরেছেন। তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের শরীরের প্রায় ৮৯ শতাংশ জেনেটিক রোগের প্রতিকার সম্ভব।
২০১৯ সালের পর থেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ২০২২ সালে ব্রড ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রাইম এডিটিংয়ের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে, যার একটি সংস্করণের নাম, পিই-ম্যাক্স। এটি প্রাইম এডিটিংয়ের কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এই পদ্ধতিটি জীবন্ত প্রাণীর দেহেও পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জিন এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে এটা এক বিশাল অগ্রগতি।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কিছু বায়োটেক কোম্পানি প্রাইম এডিটিং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে মানুষের উপর পরীক্ষামূলক চিকিৎসা শুরু করেছে। বিশেষ করে সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, লিভারের জিনগত সমস্যা এবং চোখের রেটিনার জটিলতাগুলোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ধাপের গবেষণা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল গবেষকদের আশাবাদী করে তুলেছে।  কারণ এর নিরাপত্তা ভালো এবং অফ-টার্গেট প্রায় নেই বললেই চলে।
যদিও এখনো ব্যাপকভাবে মানবদেহে এই পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়নি, তবে প্রাথমিক ফলাফল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। মনে রাখতে হবে, প্রাইম এডিটিং এখনো একটি নতুন প্রযুক্তি। এটি নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো প্রয়োজন। তবে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই হয়তো আমরা জেনেটিক রোগ থেকে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাব। হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, যখন ডাক্তাররা কেবল নির্ভুল জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমেই মানুষের কঠিন রোগ সারিয়ে তুলবেন, কোনো ছুরি-কাঁচির সাহায্য ছাড়াই।
Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments