Sunday, November 30, 2025

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ব্লগ সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সাইটে এখন, দেড়শোর বেশি বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা রয়েছে। আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানপৃথিবী এবং চাঁদ

পৃথিবী এবং চাঁদ

আমাদের বাসভূমি পৃথিবী সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ। আর চাঁদ হলো পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। সৌরজগতের সূচনা লগ্নে প্রায় একই সময়ে চাঁদ এবং পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল। এটি প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগের ঘটনা। সেই থেকে মাধ্যাকর্ষণের বাঁধায় পড়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে চাঁদ। পৃথিবীর সাথে চাঁদের গড় দূরত্ব ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। মহাজাগতিক স্কেলে এটি অতি সামান্য দূরত্ব। খুব কাছেই বলা যায়। চাঁদ থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে মাত্র ১.৩ সেকেন্ড। 

সৌরজগতে চাঁদ পৃথিবীর কতটা কাছে, সেটা দেখতে হলে যেতে হবে বেশ খানিকটা দূরে। ২০০৪ সালে নাসার রোবটিক মহাকাশযান মেসেঞ্জারকে বুধ গ্রহে পাঠানো হয়েছিল। এর কাজ ছিল খুব কাছ থেকে বুধ গ্রহকে পর্যবেক্ষণ করা। উৎক্ষেপণের প্রায় সাত বছর পর মেসেঞ্জার বুধ গ্রহের কক্ষপথে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০১০ সালের ৬ মে, বুধ গ্রহের কক্ষপথের কাছাকাছি অবস্থান থেকে মেসেঞ্জারের ক্যামেরায় পৃথিবী এবং চাঁদের একটি যুগল ছবি তোলা হয়েছিল। তখন মেসেঞ্জারের সাথে পৃথিবী এবং চাঁদের দূরত্ব ছিল ১৮৩ মিলিয়ন কিলোমিটার। এই দূরত্ব থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পৃথিবী থেকে চাঁদ কতটা কাছে। এই ছবিটি যতবারই দেখি ততবারই বিস্মিত হই। অথচ পৃথিবী থেকে চাঁদের এইটুকু দূরত্ব পাড়ি দেওয়াটাই কত কঠিন। পৃথিবীর মাত্র পাঁচটি দেশ এ পর্যন্ত চাঁদের মাটিতে সফলভাবে অবতরণ করতে পেরেছে। এই  দেশগুলো হলো: যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানের রাশিয়া), চীন, জাপান এবং ভারত। আসলে পৃথিবীর  মাধ্যাকর্ষণের প্রবল বাঁধাটা অতিক্রম করা খুব সহজ নয়।‌ ওদিকে চাঁদে সফট ল্যান্ডিং করাটাও বেশ কঠিন কাজ।‌ 

এখানে বলে রাখি, পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ  করতে চাঁদের সময় লাগে ২৭.৩ দিন। মজার ব্যাপার হলো, নিজের অক্ষের উপর একবার ঘুরে আসতেও চাঁদের ২৭.৩ দিন সময় লাগে। সেজন্য চাঁদ নিজের অক্ষের উপর ঘুরলেও, পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদের শুধুমাত্র একটি পিঠকেই দেখতে পাই। একে বিজ্ঞানীরা বলেন, “টাইডালি লকড” অবস্থা। অর্থাৎ, চাঁদের একটি পিঠই সব সময় পৃথিবীর দিকে ফিরে থাকে। অপর পিঠটি থাকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে। চাঁদের অপর পিঠকে সাধারণ ভাষায় বলা হয়, “ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন”। কিন্তু এটি টেকনিক্যালি ঠিক নয়। চাঁদের অপর পিঠেও সূর্যের আলো পড়ে‌ কিন্তু সেটা আমরা পৃথিবী থেকে দেখতে পাই না। সেজন্য চাঁদের অপর পিঠকে  “ফার সাইড অব মুন” বলাটাই যুক্তিযুক্ত। 

চাঁদ কিন্তু উপগ্রহ  হিসেবে নেহাত ছোট নয়। চাঁদ সৌরজগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। চাঁদের ব্যাসার্ধ পৃথিবীর ব্যাসার্ধের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। সৌরজগতে পৃথিবীর মতো মাঝারি সাইজের গ্রহের এত বড়  উপগ্রহ আর একটিও নেই। চাঁদের উপর যেমন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রবল প্রভাব রয়েছে, তেমনি পৃথিবীর উপরেও চাঁদের মহাকর্ষের প্রভাব রয়েছে। চাঁদের আকর্ষণের জন্যই পৃথিবীতে জোয়ার ভাটা হয়। ‌ 

আসলে সৌরজগতে পৃথিবী এবং চাঁদ খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। চাঁদ যদি না থাকতো তাহলে পৃথিবীর পরিবেশ হতো প্রতিকূল। সমুদ্রে জোয়ার ভাটার পরিমাণ দুই তৃতীয়াংশ কমে যেত। উপকূলবর্তী সামুদ্রিক জীবের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তো। সামগ্রিকভাবে বলা যায়,  সমুদ্রের খাদ্য শৃংখল এর ফলে ভেঙে পড়তো। জোয়ার ভাটা কম হওয়াতে সমুদ্র স্রোতের গতিও পরিবর্তিত হতো। এর বিরূপ প্রভাব পড়তো জলবায়ুর উপর। ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া হয়ে উঠতো চরম ভাবাপন্ন। জীবজগতের জন্য যেটা মোটেই সুখকর নয়। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীকে তার কক্ষপথে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় রেখেছে। আমরা জানি, পৃথিবী তার কক্ষপথে ২৩.৫ ডিগ্রী হেলে রয়েছে, যার ফলে ঋতু পরিবর্তন হয়। এর পেছনেও কিন্তু চাঁদের মহাকর্ষের ভূমিকা রয়েছে। চাঁদ না থাকলে এই হেলে থাকার পরিমান আরো অনেক কম অথবা অনেক বেশি হতে পারতো। এর ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া হয়ে উঠতো চরম বৈরী। মোদ্দা কথা হলো, চাঁদ মামা না থাকলে ধরণী মাতার জীবন হতো ওষ্ঠাগত। 

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, চাঁদ পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। নাসার বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন, এই সরে যাওয়ার পরিমাণ হলো বছরে ৩.৮ সেন্টিমিটার। এটা অবশ্য বিশাল কোন দূরত্ব নয়। আমাদের হাতের নখও এই রকম গতিতেই বাড়ে। সুতরাং চাঁদ মামা খুব শীগ্রই আমাদের ছেড়ে চলে যাবে তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। চাঁদ মামা আমাদের ধরনী মাতার দোসর হয়ে থাকবে আগামী আরো কয়েক বিলিয়ন বছর। এর মধ্যে খুব শিগগিরই মানুষ চাঁদে গিয়ে বসতি স্থাপন করে ফেলতে পারবে বলে আশা করা যায়। 

Tanvir Hossain
Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে প্রবল উৎসাহী। ‌স্কুলে পড়ার সময় অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। তার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তার লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ এবং মহাকাশের ছবি তোলা তার প্রধান শখ। তানভীর হোসেনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি করার পর জেনেটিক্স এবং প্ল্যান্ট ব্রিডিংয়ে মাস্টার্স করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে এক দশক কাজ করার পর অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়।‌ তারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে আই পি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments