নিউটন বনাম হাইগেনস: কণা নাকি তরঙ্গ?
সপ্তদশ শতাব্দীতে স্যার আইজ্যাক নিউটন আলোর প্রকৃতি নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছিলেন। প্রিজমের ভেতর দিয়ে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আলো সবসময় সরলরেখায় চলে। তাঁর ধারণা ছিল, আলো অসংখ্য ক্ষুদ্র কণায় (Corpuscles) ধারাবাহিকভাবে ছুটে চলে।
যদিও তাঁর সমসাময়িক অনেকেই (যেমন ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস) ভেবেছিলেন আলো একধরনের তরঙ্গ, কিন্তু নিউটনের প্রবল ব্যক্তিত্ব ও যুক্তির কারণে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন মেনে নিয়েছিলেন যে আলো কণার মতোই আচরণ করে।
থমাস ইয়াং ও ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট
এই ধারণায় প্রথম বড় আঘাতটি আসে ১৮০১ সালে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী থমাস ইয়াং এক সাধারণ অথচ যুগান্তকারী পরীক্ষা করে নিউটনের কণা তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি ডবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট নামে পরিচিত।
তিনি একটি পর্দায় পাশাপাশি দুটি সরু স্লিট বা চেরা তৈরি করলেন, যার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। আলো যদি শুধুই কণা হতো এবং সরলরেখায় চলত, তবে পর্দার পেছনে কেবল দুটো আলোর দাগই দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আশ্চর্য এক দৃশ্য।
স্লিটের পেছনে পর্দায় তৈরি হলো পরপর অনেকগুলো উজ্জ্বল আর অনুজ্জ্বল দাগের সারি। একে বলা হয় আলোর ‘ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন’ বা ব্যতিচার। এটি তখনই সম্ভব, যখন আলো একসাথে দুই স্লিট দিয়ে বেরিয়ে এসে পরস্পরের সাথে মিশে তরঙ্গের মতো আচরণ করে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো—আলো তরঙ্গের আকারে চলে।
আইনস্টাইন ও ফোটন কণা
প্রায় একশ বছর আলোকে তরঙ্গ বলেই সবাই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন আবার নতুন করে ঝামেলা বাঁধালেন। তিনি বললেন, আলো আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির প্যাকেট বা কোয়ান্টাম কণা দিয়ে তৈরি।
তিনি দেখালেন, যখন এই কণাগুলো কোনো ধাতব পৃষ্ঠে আঘাত করে, তখন ঐ পদার্থের ইলেকট্রনগুলো উত্তেজিত হয়ে বেরিয়ে আসে। এই ঘটনাকে বলা হয় ফটো-ইলেকট্রিক এফেক্ট। মজার ব্যাপার হলো, আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য নয়, বরং আলোর এই কণা ধর্ম ব্যাখ্যার জন্যই ১৯২১ সালে আইনস্টাইন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই আলোর কণার নাম দেওয়া হলো ‘ফোটন’।
কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা: এক অদ্ভুত ধাঁধা
এখন প্রশ্ন থেকে গেল, আলো যদি কণাই হয়, তবে তরঙ্গের মতো আচরণ কেন করে? বিজ্ঞানীরা শেষমেশ মেনে নিলেন এক অদ্ভুত সত্য—আলো আসলে দুই রূপেই বিদ্যমান। এটি একই সাথে কণা এবং তরঙ্গ। একে বলা হয় পার্টিকেল-ওয়েভ ডুয়ালিটি বা কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা।
কিন্তু সমস্যা হলো, একই সাথে আলোর এই দুই রূপ আমরা কখনো দেখতে পাই না:
- যখন আমরা আলোর কণা বৈশিষ্ট্য দেখি, তখন তরঙ্গ রূপটি উধাও হয়ে যায়।
- আবার আলোকে তরঙ্গ হিসেবে দেখলে তার কণা স্বভাব মিলিয়ে যায়।
ইলেকট্রন ও রহস্যময় পর্যবেক্ষণ
এই রহস্য সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা এবার আলো বাদ দিয়ে বস্তুকণা বা ইলেকট্রনের ওপরেই ডবল স্লিট পরীক্ষা চালালেন। তাঁরা ডবল স্লিটের সামনে রাখলেন ‘ইলেকট্রন বাই প্রিজম’, যা ইলেকট্রনের প্রবাহকে ভাগ করে দেয়।
ফলাফল হলো আরও আশ্চর্যজনক। স্ক্রিনে দেখা গেল সেই ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন! অর্থাৎ, ইলেকট্রনের মতো বস্তুকণাও তরঙ্গের মতো আচরণ করছে। বিজ্ঞানীরা তখন প্রতি সেকেন্ডে একটি করে ইলেকট্রন পাঠালেন। ভাবা হচ্ছিল, একা একটি ইলেকট্রন তো আর কারো সাথে মিশে তরঙ্গ তৈরি করতে পারবে না। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর স্ক্রিনে দেখা গেল, আবারও সেই একই ইন্টারফেরেন্স চিহ্ন। যেন একটি ইলেকট্রন নিজেই নিজের সঙ্গে তরঙ্গের মতো মিশে গেছে।
পর্যবেক্ষকের প্রভাব (Observer Effect)
এরপর তাঁরা ইলেকট্রন কোন পথে যাচ্ছে তা দেখার জন্য স্লিটের পথে ছোট্ট একটি ডিটেক্টর বসালেন। এবার ঘটল ভুতুড়ে কান্ড। ডিটেক্টর বসানোর সাথে সাথেই ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন উধাও! স্ক্রিনে দেখা গেল কেবল দুটি সরল রেখা।
যেন ইলেকট্রন বুঝে গেছে কেউ তাকে দেখছে, তাই সে তার ‘তরঙ্গ’ রূপ ঝেড়ে ফেলে ভদ্র ‘কণা’র মতো আচরণ করছে। ডিটেক্টর বন্ধ করতেই আবার ফিরে এলো সেই তরঙ্গ রূপ। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন, পর্যবেক্ষণের মুহূর্তেই ইলেকট্রনের ‘ওয়েভ ফাংশন’ কলাপ্স করে বা ভেঙে যায়, ফলে সে তার তরঙ্গ চরিত্র হারিয়ে কণায় পরিণত হয়।
কোয়ান্টাম জগতের বিস্ময়
কোয়ান্টাম জগৎ আসলেই এক অদ্ভুত রাজ্য। এখানে আমাদের পরিচিত জগতের নিয়ম খাটে না। এখানে:
- সুপারপজিশন: একই কণা একই সাথে একাধিক স্থানে থাকতে পারে।
- এনট্যাঙ্গলমেন্ট: দুই কণা এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে আলোকবর্ষ দূরে থাকলেও একটির পরিবর্তনে অন্যটি সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়।
- টানেলিং: কণা কখনো কখনো শক্ত প্রাচীর ভেদ করে অন্য পাশে চলে যায়।
নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান তাই একবার যথার্থই বলেছিলেন, “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যাপার স্যাপার আসলে কেউ কিছু বোঝে না।” কথাটি ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। সেই অনিশ্চিত ও সম্ভাবনাময় কোয়ান্টাম জগতেই বিজ্ঞানীরা এখনো মহাবিশ্বের মূল চাবিকাঠি খুঁজে চলেছেন।
