Friday, January 16, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeবিবিধ বিজ্ঞানসময়ের অনুক্রম

সময়ের অনুক্রম

আমরা মনে করি সময় নিয়ে আমাদের ধারণাটি একেবারে সঠিক। কিন্তু নিশ্চিত জিনিসগুলোই অনেকসময় সবচেয়ে বেশি ধোঁকা দেয়। সময় কি সত্যিই একমুখী? সময় কি সত্যিই সবার কাছে একই? নাকি সময় হলো এমন এক রহস্য, যেটা শুধু সামনে এগোয় বলে আমরা তাকে সহজ ভাবি? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে – সময় শুধু ঘড়ির কাঁটার একটানা টিকটিক শব্দ নয়, সময় হলো মহাবিশ্বের কাঠামোর অংশ, যার ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে তীব্র বিস্ময়। আর সেই বিস্ময় নিয়েই আজকের লেখা “সময়ের অনুক্রম”।

সময়ের স্রোতে

সময় বহতা নদীর মত। নদীর স্রোত যেমন উজান থেকে ভাটির দিকে বয়ে চলে, তেমনি সময়ের স্রোত অতীত থেকে বর্তমানের ভেতর দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের এই একমুখী স্রোতে আমরা প্রতিনিয়ত ভেসে চলেছি। সময়ের স্রোত এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে। অনেকে একে বলেন, “অ্যারো অফ টাইম” – সময়ের তীর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সময়ের এই স্রোতকে কি থামানো যায়? সময়ের গতিকে কি কোনভাবে বদলানো সম্ভব? কিংবা সময়ের বিপরীতে কি যাওয়া যায়? এসব প্রশ্ন শুনতে উদ্ভট লাগলেও মানুষের কৌতূহল বরাবরই এমন। যাকে অসম্ভব মনে হয়, তার দরজায় কড়া নাড়তে ভালোবাসে। তবে এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে, চলুন দেখা যাক সময় ব্যাপারটি আসলে কী, এবং কীভাবে মহাবিশ্বে সময়ের সূচনা হয়েছিল।

সময়ের জন্ম

বিজ্ঞানীদের মতে, এখন থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং (Big Bang) থেকে আমাদের চেনা মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। এই মহাবিস্ফোরণের পরপরই মহাবিশ্ব অতি দ্রুত প্রসারিত হওয়া শুরু করে এবং অদ্যাবধি প্রসারিত হয়েই চলেছে। এই প্রসারণের ফলে মহাবিশ্বে স্থানের (space) সৃষ্টি হয়েছে – যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা – এই তিনটি স্থানিক মাত্রা (spatial dimension) রয়েছে।

কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের গল্পটা শুধু “স্থান তৈরি” দিয়ে শেষ হয় না। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই মহাবিস্ফোরণের ফলে তিনটি স্থানিক মাত্রার পাশাপাশি আরও একটি ভিন্ন মাত্রারও সূচনা হয়েছিল। মহাবিশ্বে কোনো বিন্দুকে সম্পূর্ণভাবে চিহ্নিত করতে হলে ত্রিমাত্রিক স্থানের পাশাপাশি এই চতুর্থ মাত্রাটিরও উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর এই চতুর্থ মাত্রাটিই হলো, সময় বা কাল (time)।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বিগ ব্যাংয়ের আগে স্থান এবং কালের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সবকিছুই ছিল একটি কেন্দ্রবিন্দুতে চরম ঘন, চরম উত্তপ্ত, স্থির অবস্থায় – যার নাম সিঙ্গুলারিটি। বিগ ব্যাংয়ের ফলে সেই একক বিন্দু থেকেই একই সাথে স্থান এবং কালের সৃষ্টি হয়েছিল।

এখানে একটা গভীর ব্যাপার আছে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে স্থান এবং কালকে আলাদা মনে করি। একটা হলো ‘কোথায়’, আরেকটা হলো ‘কখন’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্বের গঠন দাঁড়িয়ে আছে স্থান-কাল (space-time) নামের এক যৌথ বুননের ওপর। বিজ্ঞানীরা এই কাঠামোটির নামই দিয়েছেন স্পেস-টাইম। মোদ্দা কথা হলো, মহাবিশ্বে স্থান এবং কাল পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, এদের আলাদা করে ভাবলে আমরা বাস্তবতাকে অসম্পূর্ণ দেখি।

সময়ের গতি

সহজ করে বললে, সময় হচ্ছে মহাবিশ্বের একটি অন্যতম মাত্রা, যার প্রভাবে মহাবিশ্ব সর্বদাই পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তনের এই চলমান ধারাটাকেই আমরা সময়ের গতি হিসেবে চিহ্নিত করেছি।
আমাদের হিসেবের সুবিধার জন্য পৃথিবীর আহ্নিক এবং বার্ষিক গতির উপর ভিত্তি করে সময়কে বছর, মাস, দিন, ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড ইত্যাদি এককে ভাগ করে নিয়েছি। আমাদের দৈনন্দিন হিসেবে সময়ের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে এক সেকেন্ড!

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই “প্রতি সেকেন্ডে এক সেকেন্ড”, এটা আসলে একটি অভ্যাসগত অনুভব। প্রকৃতি সময়কে এমন কড়া নিয়মে বেঁধে দেয়নি যে সব জায়গায়, সব অবস্থায়, সব পর্যবেক্ষকের কাছে সময় একইভাবে চলতেই হবে। ঠিক যেমন নদীর স্রোতের গতি সব জায়গায় এক নয়, কোথাও টলটলে, কোথাও উন্মত্ত। সময়ও তেমনি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে বয়ে যেতে পারে।

আইনস্টাইনের বিপ্লব: সময় আপেক্ষিক

এইখানেই আসে আইনস্টাইনের বিস্ময়কর ধারণা। আইনস্টাইন বলেছেন, সময়ের গতি ধ্রুব নয়- এটি আপেক্ষিক। অর্থাৎ সময়ের গতি নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের ওপর। কে দেখছে, কোথা থেকে দেখছে, কী গতিতে চলছে, কী ধরনের মহাকর্ষের ভেতর আছে, সবকিছুর সাথে সময়ের চলার গতি জড়িয়ে থাকে।

  • বিশেষ আপেক্ষিকতা: গতির কারণে সময় ধীর হয়

আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বস্তুর গতির কারণে সময়ের গতি কমে যায়। কোনো বস্তু আলোর গতির কাছাকাছি চলতে থাকলে সেই বস্তুর ভেতরে থাকা ঘড়ি বাইরের তুলনায় ধীরে চলে। তাত্ত্বিকভাবে কোনো বস্তু যদি আলোর গতিতে পৌঁছাতে পারত, তাহলে তার জন্য সময় সম্পূর্ণভাবে থেমে যেত।

  • সাধারণ আপেক্ষিকতা: মহাকর্ষ সময়কে সংকুচিত করে

পরবর্তীতে আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে বলেছেন, মহাকর্ষ বলের প্রভাবেও সময়ের গতি কমে যায়। সেজন্য পৃথিবী পৃষ্ঠে সময়ের গতি পর্বত শৃঙ্গে সময়ের গতির চেয়ে কিছুটা কম। কারণ নিচে নামলে পৃথিবীর মহাকর্ষের টান তুলনামূলক বেশি।

বস্তুর গতি বা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সময়ের গতির পরিবর্তনকে বলে টাইম ডাইলেশন (time dilation) বা সময় প্রসারণ। এটা কল্পকাহিনি নয়, এটা প্রকৃতির একটি বাস্তব নিয়ম।

কেন আমরা টাইম ডাইলেশন বুঝতে পারি না?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে টাইম ডাইলেশনের পরিমাণ এতই সামান্য যে আমরা একে ঠিক টের পাই না। আমরা অবশ্য প্রকৃতিতে এমন বহু ঘটনা দেখি, যেগুলো বাস্তবে অন্যরকম, কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতায় সেটা ধরা পড়ে না।

যেমন ধরুন, পৃথিবীর পৃষ্ঠ আমাদের কাছে সমতল মনে হয়, অথচ পৃথিবী গোলাকার। পৃথিবীকে গোলাকার দেখতে হলে, আমাদেরকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ ছেড়ে মহাশূন্যে অনেক দূর উপরে উঠতে হবে। আবার প্রতিদিন সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখে আমাদের মনে হতে পারে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীই নিজের অক্ষের উপর ঘুরছে। আমরা শুধু সেই ঘূর্ণনের ফলাফলকে চোখে দেখি।

টাইম ডাইলেশনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তেমনি। পার্থক্যটা হয় মাত্র কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডে।
মাইক্রোসেকেন্ড হলো সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। এত ক্ষুদ্র পার্থক্য মাপতে লাগে এটমিক ক্লক- যেটা সময় মাপে পরমাণুর কম্পনের নির্ভুল ছন্দে।

এটমিক ক্লকের সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সময়ের গতির অতি সামান্য পার্থক্য বিজ্ঞানীরা নিরূপণ করতে পারেন। বিজ্ঞান এখানে আমাদের চোখের সীমা ভেঙে দেয়; দেখায় এমন এক বাস্তবতা, যেটা আমাদের সাধারণ অনুভবে ধরা পড়ে না।

GPS:  টাইম ডাইলেশনের বাস্তবতা

টাইম ডাইলেশন আমরা টের না পেলেও এর বাস্তবিক প্রয়োগ আমরা প্রায় প্রতিদিন করছি। আজকাল গাড়িতে পথ নির্দেশনার জন্য জিপিএস (GPS) স্যাটেলাইটের সাহায্য নেওয়া হয়। এসব স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে অনেক উঁচুতে মহাশূন্যে অবস্থান করছে।

স্যাটেলাইটগুলো আলোর গতির কাছাকাছি নয়; সেকেন্ডে মাত্র ৩.৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে আলোর গতি হলো সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। অর্থাৎ স্যাটেলাইটের গতি আলোর গতির একটি অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। কিন্তু তারপরও গতির জন্য টাইম ডাইলেশনের কারণে জিপিএস স্যাটেলাইটের ঘড়ি প্রতিদিন সামান্য স্লো হয়ে যায়।
আবার পৃথিবী থেকে অনেক উপরে থাকার ফলে স্যাটেলাইটে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান তুলনামূলক কম। ফলে মহাকর্ষজনিত টাইম ডাইলেশনের কারণে স্যাটেলাইটের ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় সামান্য ফাস্ট চলে।

এই দুই প্রভাব মিলিয়ে জিপিএসের ঘড়িতে প্রতিদিন মোটামুটি ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ড পার্থক্য তৈরি হয়। আমাদের দৈনন্দিন সময়ের হিসাবে এটা খুব বেশি কিছু নয়। কিন্তু জিপিএসের কাজ হলো অবস্থান নির্ণয় করা আলোর বেগে চলা সিগনালের সময় ধরে। সেখানে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের ভুল মানে পৃথিবীর মানচিত্রে কয়েক কিলোমিটার ভুল! সেজন্য জিপিএস স্যাটেলাইটের ঘড়িগুলোকে নিয়মিত ক্রমান্বয় (calibration) করা হয়। তা না হলে জিপিএস সঠিকভাবে কাজই করত না।

দুই জমজ ভাইয়ের গল্প

এবার টাইম ডাইলেশনের ব্যাপারটি আরও সহজ করে বোঝার জন্য দু’জন জমজ ভাইয়ের গল্প‌ বলি।
ধরা যাক, জমজ ভাইয়ের একজন বাস করে সমুদ্র উপকূলে, আরেকজন বাস করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দশ হাজার ফুট উচ্চতায় একটি পাহাড়ি শহরে। পাঁচ বছর পর দেখা হলে দেখা যাবে, সমুদ্র উপকূলে থাকা ভাইটির বয়স পাহাড়ি ভাইটির চেয়ে সামান্য বেশি। তবে ব্যবধান হবে মাইক্রোসেকেন্ডে। চোখে দেখে বোঝার কোন উপায় নেই।

কিন্তু আলোর গতির কাছাকাছি যাত্রা করলে বয়সের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠবে। মনে করুন, একজন জমজ ভাইকে রকেটে করে মহাশূন্যে পাঠানো হলো, অন্যজন পৃথিবীতে থাকলো। রকেটটি যদি আলোর গতির কাছাকাছি (ধরা যাক ৯৯%) গতিতে পাঁচ বছর চলার পর ফিরে আসে, তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীতে কেটে গেছে অনেক অনেক বেশি সময়, প্রায় ছত্রিশ বছর।

কিন্তু কেন এমন হবে? কারণ প্রচণ্ড গতির ফলে রকেটের ভেতর সময় ধীর হয়ে গিয়েছিল। একজনের কাছে যেটা পাঁচ বছর, অন্যজনের কাছে সেটা ছিল ছত্রিশ বছর। ভ্রমণ শেষে মহাশূন্যচারী ভাইটি পৃথিবীর ভাইয়ের তুলনায় একত্রিশ বছর কম বয়সী হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, সে ফিরে আসবে ভবিষ্যতে- একত্রিশ বছর পরের পৃথিবীতে। এটা কল্পকাহিনি নয়। এটা আপেক্ষিকতার সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী। বিজ্ঞান এখানে আমাদের বাস্তবতাকে নতুন করে সংজ্ঞা দেয়।

“সময় বিভ্রম”—কিন্তু কীভাবে?

সময় আসলে এক ধরনের বিভ্রম (illusion)- এ কথা অনেকেই বলেন। তবে এর মানে এই নয় যে “সময় বলে কিছু নেই”। বরং এর মানে হলো, সময়কে আমরা যেভাবে একেবারে কঠিন, সার্বজনীন, সবার জন্য একই বলে ধরে নিয়েছিলাম, প্রকৃতি আসলে তেমন নয়।

গতি এবং মহাকর্ষের বিবেচনায় একেক দর্শকের কাছে সময়ের গতি একেক রকম মনে হতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকে মনে করে তার সময়টাই স্বাভাবিক। এটাই প্রকৃতির রহস্য। সবাই নিজের ঘড়িকে “ঠিক” মনে করে, অথচ দুটো ঘড়ি একে অপরের তুলনায় আলাদা চলতে পারে!

এনট্রপি: সময়ের তীর কোথা থেকে আসে?

কিন্তু একটা মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, সময় কেন একদিকে যায়? কেন অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ? কেন আমরা ভবিষ্যৎ “মনে করতে” পারি না, কিন্তু অতীত স্মরণ করতে পারি?

এই রহস্য ধরতে বিজ্ঞানীরা আশ্রয় নিয়েছেন থার্মোডায়নামিক্স বা তাপগতিবিদ্যার। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে, মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার নামই এনট্রপি (entropy)।

মহাবিশ্বের শুরুতে এনট্রপি ছিল কম, ক্রমে তা বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এনট্রপি বাড়ার ফলেই “অ্যারো অফ টাইম” সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কম এনট্রপি মানে অতীত, বেশি এনট্রপি মানে ভবিষ্যৎ। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষণিক মুহূর্তটাকেই আমরা বলি – বর্তমান। কিন্তু বর্তমানকে ধরে রাখা যায় না। সময় এগিয়ে যায়, কারণ এনট্রপি সবসময় বাড়তে থাকে। এ যেন প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম। ঘড়ির কাঁটা শুধুমাত্র সামনেই যাবে, পেছনে নয়।

ঘড়ি যত নিখুঁত, এনট্রপি তত বাড়ে

সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সময় ও এনট্রপির সম্পর্ক নিয়ে খুব আগ্রহজনক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁদের গবেষণার সারকথা এমন – একটি ঘড়ি যত নিখুঁতভাবে সময় মাপবে, সেই ঘড়িকে সময় মাপাতে গিয়ে তত বেশি শক্তি ব্যয় হবে, ফলে তত বেশি বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপি তৈরি হবে। অর্থাৎ সময়কে “ধরা” বা “মাপা” নিজেও যেন প্রকৃতির কাছে একটা খরচ দাবি করে।

এ ধরনের গবেষণা আমাদের ভাবায় – সময় কি শুধু একটি নিরপেক্ষ মাত্রা, নাকি সময় পরিমাপের সাথে মহাবিশ্বের শক্তি প্রবাহের এক গভীর যোগ আছে?
তবে এনট্রপিই সময়ের একমাত্র ব্যাখ্যা – এ কথা এখনো চূড়ান্তভাবে বলা যায় না। বিজ্ঞান এখানেও দ্বিধায়, প্রশ্নে এবং অনুসন্ধানে।

লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি: সময় কি কণার মত ?

আরেকদল বিজ্ঞানী স্থান-কালের বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের কাছে স্থান-কাল একটি কোয়ান্টাম ক্ষেত্র (quantum field), যেখানে স্থান এবং কালের ক্ষুদ্রতম একক রয়েছে।

স্থানের ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য হলো প্ল্যাঙ্ক লেংথ (১.৬ × ১০^-৩৫ মিটার)। এর নিচে স্থানের অস্তিত্ব নেই। তেমনি সময়ের ক্ষুদ্রতম একক হলো প্ল্যাঙ্ক টাইম (প্রায় ৫.৪ × ১০^-৪৪ সেকেন্ড)। এর কমে সময়ের অস্তিত্ব নেই।

এই অতি ক্ষুদ্র স্থান-কালগুলো পরস্পরের সাথে লুপ বা ফাঁসের মত জড়িয়ে এক ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যাকে বলা হয়, স্পিন নেটওয়ার্ক। এরপর এই নেটওয়ার্কগুলো যুক্ত হয়ে তৈরি করে স্পিন ফোম। এই ধারার তত্ত্বের নাম হলো,  লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (LQG)।

এই তত্ত্বে স্থান এবং সময় যেন ধারাবাহিক স্রোত নয়, বরং অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কাঠামো। তবে এখনো পর্যন্ত এর পক্ষে কোন পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই। এটা গাণিতিকভাবে আকর্ষণীয় তত্ত্ব, কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় এখনো ধরা দেয়নি।

ব্লক ইউনিভার্স: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ কি একসাথে আছে?

সময় সম্পর্কে আরেকটি বিস্ময়কর ধারণা হলো, ব্লক ইউনিভার্স থিওরি। এই ধারণা অনুসারে মহাবিশ্বে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ- সবকিছুই একই সাথে বিরাজমান। সময়কে আমরা যেমন “চলমান” ভাবি, বিশ্বপ্রকৃতি হয়তো তেমন নয়।

ব্লক ইউনিভার্স তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়ের ভেতরে “আগে-পরে” বলে আলাদা কিছু নেই। আমরা শুধু বর্তমানকে দেখি, কারণ আমাদের ইন্দ্রিয় এবং চেতনা একটা নির্দিষ্ট দিকেই অভ্যস্ত। সময়ের এই বিভাজন- অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ – সম্ভবত মানুষের অনুভবের নির্মাণ, বাস্তবতার নয়। এটা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, পদার্থবিজ্ঞানে এমন ধারণা নেহাত উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শেষ কথা: সময়ের রহস্য এখনো অজানা

সবশেষে সত্যিটা হলো – মানুষের কাছে সময়ের মৌলিক চরিত্রটি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সময় কখনো নদীর মতো বয়ে চলে, কখনো ঘড়ির কাঁটার মতো এগোয়, কখনো আবার গতি ও মহাকর্ষের কারণে ধীর হয়ে যায়। সময়কে আমরা প্রতিদিন অনুভব করি, কিন্তু সময় আসলে কী- তার গভীরতম উত্তর এখনো অধরা।

সময় প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের লেখা একটি বিখ্যাত চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। আইনস্টাইন তাঁর এক প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে চিঠিতে লিখেছিলেন,

“এই অদ্ভুত পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে সে আমার চেয়ে সামান্য এগিয়ে গেল। এতে আসলে তেমন কিছুই এসে যায় না। কারণ আমরা যারা পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, তাদের কাছে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের মাঝের বিভাজন শুধুই এক ধরনের অদম্য বিভ্রম”।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular