আজ ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫। আজ দক্ষিণায়ন। পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে আজ এই বছরের দীর্ঘতম দিন। অন্যদিকে, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে আজ দিনের দৈর্ঘ্য হবে সবচেয়ে ছোট। এর বৈজ্ঞানিক কারণ হলো, আজ সূর্য বিষুবরেখার সাড়ে তেইশ ডিগ্রি দক্ষিণে মকরক্রান্তি রেখার (Tropic of Capricorn) উপর সরাসরি অবস্থান করছে। বার্ষিক সৌর পরিক্রমায় সূর্যের দক্ষিণমুখী যাত্রা এখানেই এসে আজ শেষ হচ্ছে।
এরপর শুরু হবে সূর্যের উত্তরমুখী যাত্রা। এর ফলে উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে, আর দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ক্রমশ ছোট হতে থাকবে।
সূর্যের বার্ষিক গতিপথ ও অয়ন
বিষুবরেখার সাড়ে তেইশ ডিগ্রি উত্তরে ও দক্ষিণে সূর্যের দূরতম অবস্থানকে বলা হয় অয়ন। ইংরেজি নাম, সলেস্টিস (Solstice)। বছরে দু’বার এই অয়ন ঘটে:
- দক্ষিণায়ন (Winter Solstice): উত্তর গোলার্ধে ডিসেম্বর মাসের ২১ অথবা ২২ তারিখে হয়।
- উত্তরায়ন (Summer Solstice): জুন মাসের ২০ অথবা ২১ তারিখে হয়।
মজার ব্যাপার হলো, দক্ষিণ গোলার্ধে এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। সেখানে দক্ষিণায়নকে ঘিরে গ্রীষ্মকাল এবং উত্তরায়নকে ঘিরে শীতকাল আবর্তিত হয়। এই কারণেই দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়ায় ডিসেম্বর মাসে এখন গ্রীষ্মকাল চলছে, আর উত্তর গোলার্ধে বাংলাদেশে ডিসেম্বর মাস মানেই শীতকাল।
আগামী বছরের ২১ জুন সূর্য বিষুবরেখার সাড়ে তেইশ ডিগ্রি উত্তরে কর্কটক্রান্তি রেখায় (Tropic of Cancer) এসে পৌঁছাবে। সেই দিনটি হবে উত্তর গোলার্ধের সবচেয়ে বড় দিন। এরপর আবার শুরু হবে সূর্যের দক্ষিণমুখী যাত্রা। পৃথিবীর আকাশে সূর্যের উত্তর ও দক্ষিণমুখী এই দীর্ঘ যাত্রা অনাদিকাল থেকেই একই ছন্দে চলেছে।
ঋতু পরিবর্তনের আসল কারণ
অনেকে মনে করেন সূর্যের নিজস্ব গতি থেকেই ঋতু পরিবর্তন ঘটে। বাস্তবে তা নয়। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে ঘিরে সূর্যের নিজস্ব গতি থাকলেও সেটি পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখে না। সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্য আপাত স্থিরই থাকে।
ঋতু পরিবর্তনের আসল কারণগুলো হলো:
- সূর্যের কক্ষপথের তুলনায় পৃথিবীর নিজস্ব অক্ষ প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকা।
- পৃথিবীর বার্ষিক গতি বা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করা।
এই হেলে থাকার কারণেই বর্ষ পরিক্রমায় পৃথিবীর দুই গোলার্ধে সূর্যের আপাত অবস্থানে তারতম্য ঘটে এবং এর ফলে ঋতুর পরিবর্তন হয়। পৃথিবী যদি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় হেলে না থাকতো, তাহলে ঋতু পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই উঠত না। এ কারণেই ভূগোলে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার গুরুত্ব এত বেশি।
ভৌগোলিক রেখা ও জনসচেতনতা
পৃথিবীর অনেক দেশেই জনবহুল এলাকার উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি কিংবা মকরক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। এসব দেশে জনসাধারণের জন্য এই ভৌগোলিক রেখাগুলোকে বিশেষ মার্কার দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ঋতু পরিবর্তনে এদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
- উত্তর গোলার্ধে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কর্কটক্রান্তি রেখার এমন চিহ্ন দেখা যায়।
- দক্ষিণ গোলার্ধে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে রয়েছে মকরক্রান্তি রেখার মার্কার।
বাংলাদেশেও কুমিল্লা শহরের কাছ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। কুমিল্লার মতো জনবহুল এলাকায় এই রেখার অবস্থান চিহ্নিত করে তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরা হলে ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে আগ্রহ ও সচেতনতা বাড়বে।
