প্রকৃতির অদৃশ্য দেয়াল
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের এক আশ্চর্য সীমানা হলো ওয়ালেস লাইন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর অস্ট্রেলেশিয়ার মাঝামাঝি ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালীর ভেতর দিয়ে টানা এই অদৃশ্য রেখাটি যেন প্রকৃতির তৈরি এক দুর্ভেদ্য দেয়াল।
উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ প্রকৃতিবিদ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস যখন ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরছিলেন, তখনই তিনি প্রথম লক্ষ্য করলেন এর বিস্ময়কর প্রভাব। এজন্যই অদৃশ্য এই রেখাটির নামকরণ করা হয়েছে, ওয়ালেস লাইন।
পাশাপাশি দ্বীপ, ভিন্ন জগৎ
ইন্দোনেশিয়ার অন্তর্ভুক্ত পাশাপাশি দ্বীপ হলেও জীববৈচিত্র্যে এদের মধ্যে দেখা যায় বিরাট তফাৎ। যেন কোন এক অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে।
- বোর্নিও ও বালি: এখানে দেখা যায় ওরাংওটাং, বন্য শূকর, ছোট আকারের এশীয় হাতি ও অন্যান্য পরিচিত এশীয় প্রাণী। বালিতে একসময় “বালি টাইগার” ছিল, যা এখন বিলুপ্ত।
- লম্বক ও সুলাওয়েসি: অথচ সামান্য দূরের লম্বক থেকে শুরু করে সুলাওয়েসির মতো দ্বীপের প্রাণীকুল একেবারেই ভিন্ন। সেখানে এশীয় প্রাণীর সংখ্যা কমে গিয়ে দেখা যায় কুসকুসের মতো থলেবিশিষ্ট মারসুপিয়ালসহ কিছু অনন্য প্রজাতি, যেগুলো অস্ট্রেলেশিয়ার প্রাণীজগতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
একই সমুদ্রসীমার ভেতরে থেকেও প্রাণীদের এই বিভাজন সত্যিই বিস্ময়কর। রাসেল ওয়ালেস বুঝতে পারলেন, এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস।
ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও টেকটোনিক প্লেট
আসলে এশিয়া আর অস্ট্রেলিয়া ছিল আলাদা টেকটোনিক প্লেটের অন্তর্ভুক্ত। তাদের মাঝখানে থাকা গভীর সমুদ্রচ্যানেল, যেমন লম্বক প্রণালী, বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য এক অতিক্রম অযোগ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ফলে একপাশে থেকে গেছে এশিয়ার বড় বড় প্রাণীরা, আর অন্যপাশে টিকে গেছে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব প্রাণীকুল।
শুধু প্রাণী নয়, উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য স্পষ্ট। একদিকে নারকেল, বাঁশ কিংবা এশীয় বর্ষাবনের গাছ, অন্যদিকে ইউক্যালিপটাস কিংবা অ্যাকাসিয়া পরিবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার উদ্ভিদ। এই অদৃশ্য সীমানার জন্যই লম্বক প্রণালীর সমুদ্রপথে দাঁড়িয়ে পাশাপাশি দুই ভিন্ন জগতের প্রকৃতি দেখা যায়।
জীবভূগোলের ধ্রুপদী উদাহরণ
আজ বিজ্ঞানীরা ওয়ালেস লাইন-কে জৈবভূগোলের এক ক্লাসিক উদাহরণ মনে করেন। এটি প্রমাণ করে, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা প্রজাতির বিস্তার আর বিবর্তনকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ওয়ালেস লাইন আমাদের আরো শেখায়, জীববৈচিত্র্য নিছক দৈবচয়ন নয়, বরং বহু লক্ষ বছরের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন আর প্রজাতির অভিযোজনের ফল। প্রকৃতির এই রেখা শুধু দ্বীপগুলোকে নয়, বরং দুই ভিন্ন মহাদেশের জীব বিবর্তনের ইতিহাসকেই আলাদা করে তুলে ধরে।
পৃথিবীর অন্যান্য জীব-বিভাজন
ওয়ালেস লাইনের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, পৃথিবীর প্রতিটি ভৌগলিক সীমারেখাই জীব বিবর্তনের বিস্ময়কর কাহিনি বহন করে। আর শুধু ওয়ালেস লাইন নয়, পৃথিবীর আরও নানা প্রান্তে এরকম জীব বিভাজন দেখা যায়:
- হিমালয় পর্বতমালা: এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার প্রাণীকুলকে আলাদা করেছে।
- সাহারা মরুভূমি: উত্তর ও সাব-সাহারান আফ্রিকার জীববৈচিত্র্যের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- পানামা স্থলসেতু: উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রাণীকুলকে মিলিয়ে দিয়ে নতুন রূপ তৈরি করেছে।
- গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ: দক্ষিণ আমেরিকার মূল খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে স্বতন্ত্র প্রাণীকুল গড়ে তুলেছে, যার অনন্য বৈচিত্র্য চার্লস ডারউইনকে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
এসব উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভূগোল আর জীববিজ্ঞানের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; আর এই পারস্পরিক সম্পর্কই গড়ে তুলেছে আজকের পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় জীবজগত।
