Sunday, March 1, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeমহাকাশ বিজ্ঞানচেনা সূর্যের অচেনা অন্তর

চেনা সূর্যের অচেনা অন্তর

আমাদের কাছের নক্ষত্র

প্রতিদিন আমরা সূর্যকে দেখি। ভোরের কোমল আলোয় পৃথিবী ধীরে ধীরে জেগে ওঠে, দুপুরে তার তেজে চারপাশ ঝলসে ওঠে, আর সন্ধ্যায় অস্তরাগে আকাশ রঙিন হয়ে যায়। আমাদের জীবনের প্রতিটি ছন্দ, প্রতিটি দিনের শুরু আর শেষ, সবকিছুর সাথেই সূর্য ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এত চেনা, এত কাছের, অথচ এই সূর্যই আসলে মহাবিশ্বের এক বিশাল, জটিল আর অস্থির শক্তির কারখানা।

বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্য হলো আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। আয়তনে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় তের লক্ষ গুণ বড়, মাঝারি ভরের একটি তারা। এই তারা থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় নেয় মাত্র আট মিনিট। আর এই আট মিনিটের আলোর পথ পেরিয়েই আমাদের দিন শুরু হয়। সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীসহ সৌরজগতের সবগুলো গ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে। সূর্যের চারপাশে ‌পৃথিবী তার কক্ষপথে সামান্য হেলে থাকার কারণেই বদলে যায় ঋতু, বদলে যায় প্রকৃতির রং।

শক্তির উৎস: নিউক্লিয়ার ফিউশন

কিন্তু এই পরিচিত আলোর উৎসের ভেতরের গল্পটা অনেক বেশি নাটকীয়। সূর্য মোটেও শান্ত, স্থির কোনো আলোর বল নয়। সূর্য আসলে এক বিশাল উত্তপ্ত প্লাজমার গোলক, যার ভেতরে চলছে অবিরাম নিউক্লিয়ার ফিউশন, বাইরে চলছে চৌম্বক ঝড়ের বিস্ফোরণ, আর মাঝখানে কোটি বছরের স্কেলে ধীরে ধীরে ভ্রমণ করছে শক্তি।

সূর্যের গভীরে, একদম কেন্দ্রে, তাপমাত্রা প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪ মিলিয়ন টন ভর সরাসরি শক্তিতে রূপ নেয় আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত $E=mc^2$ সমীকরণ অনুযায়ী। এই শক্তিই আলো হয়ে, তাপ হয়ে, জীবনের শক্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো সৌরজগতে।

ফোটনের দীর্ঘ যাত্রা

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সূর্যের ভেতরে তৈরি হওয়া আলোর কণা বা ফোটন আমাদের কাছে পৌঁছাতে সরাসরি পথ খুঁজে পায় না। সূর্যের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের কয়েক হাজার থেকে প্রায় এক লক্ষ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কারণ তারা সোজা বের হতে পারে না; বারবার শোষিত হয়, আবার নির্গত হয়। যেন এক ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অন্ধের মতো পথ খুঁজে এগোচ্ছে। কিন্তু একবার সূর্যের পৃষ্ঠে পৌঁছালে সেই একই ফোটন পৃথিবীতে পৌঁছে যায় মাত্র আট মিনিটে। অর্থাৎ, আমরা আজ যে সূর্যের আলো দেখছি, সেই আলোর জন্ম হয়েছিল মানব সভ্যতা শুরু হওয়ারও বহু আগে। ভাবা যায়?

সূর্যের গঠন ও করোনা রহস্য

সূর্যের গঠনও বেশ কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত। একদম কেন্দ্রে রয়েছে কোর (Core), যেখানে মূল শক্তি উৎপাদনের কাজ চলে। তার বাইরে রয়েছে রেডিয়েটিভ জোন (Radiative Zone), এই স্তরের মধ্য দিয়ে আলো অত্যন্ত ধীরগতিতে বাইরের দিকে এগোতে থাকে। এর পরের স্তরটি হলো কনভেকশন জোন (Convection Zone), যেখানে উত্তপ্ত প্লাজমা ফুটন্ত পানির মতো ওপরে উঠে আসে এবং ঠান্ডা হয়ে আবার নিচে নেমে যায়। আর সবার বাইরে আমরা যে উজ্জ্বল পৃষ্ঠটি দেখি, তার নাম ফটোস্ফিয়ার (Photosphere)। এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৫৫০০ থেকে ৬০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কিন্তু সূর্যের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ হলো করোনা। এটি সূর্যের বাইরের দিকের একটি হালকা এবং বিস্তৃত আবরণ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেখানে মাত্র কয়েক হাজার ডিগ্রি, সেখানে করোনার তাপমাত্রা ১০ থেকে ২০ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্রের জট পাকানো এবং শক্তিশালী তরঙ্গের আঘাত করোনাকে এত উত্তপ্ত করে তোলে। তবে করোনার এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রার পুরো রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

হেলিওসিসমোলজি ও সূর্যের হৃদস্পন্দন

সূর্যকে যদি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে দেখা হয়, তখন দেখা যায় সূর্যের শরীর যেন টগবগ করে ফুটছে। এটি মূলত কনভেকশন স্তরের প্লাজমার প্রবাহের ফল। কিন্তু এর বাইরেও সূর্যের নিজস্ব একটি কম্পন বা হৃদস্পন্দন রয়েছে। প্রতি পাঁচ মিনিটে সূর্যের ভেতরে ওঠানামা হয়। এই কম্পন বা শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের ভেতরের গঠন বোঝার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখাটিকে বলা হয় হেলিওসিসমোলজি বা সৌরকম্পন বিদ্যা।

সানস্পট ও সৌরচক্র

সূর্যের মেজাজও সবসময় স্থির থাকে না। সূর্যের গায়ে মাঝে মাঝে কালো দাগ বা সানস্পট দেখা যায়। এগুলো আসলে সূর্যের পৃষ্ঠের এমন কিছু অঞ্চল যেখানে তাপমাত্রা আশেপাশের তুলনায় কম। এর কারণ হলো সেখানে থাকা ভয়ংকর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, যা ভেতর থেকে উঠে আসা উত্তপ্ত প্লাজমার স্বাভাবিক চলাচলকে আটকে দেয়। ফলে সেই জায়গাটি তুলনামূলক ঠান্ডা হয়ে কালো দেখায়।

এক অর্থে সানস্পট হলো সূর্যের অভ্যন্তরের চৌম্বক ঝড়ের দৃশ্যমান চিহ্ন। সূর্যের এই কার্যকলাপ একটি নির্দিষ্ট ছন্দে বাড়ে এবং কমে, যাকে সৌরচক্র বলা হয়। এই চক্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ বছর। যখন সানস্পটের সংখ্যা বেশি থাকে, তখন তাকে বলা হয় সোলার ম্যাক্সিমাম, অর্থাৎ সূর্য তখন খুব বেশি সক্রিয় থাকে। আবার যখন সানস্পট কমে যায়, তখন আসে সোলার মিনিমাম, বা সূর্যের শান্ত পর্যায়।

সৌরঝড় ও পৃথিবীর ঝুঁকি

কখনো কখনো সূর্য মহাশূন্যে প্রচণ্ড শক্তির বিস্ফোরণ ঘটায়। সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্র হঠাৎ ভেঙে আবার জোড়া লাগলে তৈরি হয় সোলার ফ্লেয়ার। আর সূর্যের বাইরের স্তর থেকে বিশাল প্লাজমার মেঘ ছিটকে বের হলে তাকে বলা হয়, করোনাল মাস ইজেকশন (CME)।

এই চার্জযুক্ত কণার ঝড় পৃথিবীর চুম্বকমণ্ডলে আঘাত করলে আকাশে চমৎকার অরোরা বা মেরুজ্যোতি তৈরি হয়। কিন্তু একই সাথে এটি আমাদের স্যাটেলাইট, জিপিএস, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ গ্রিডে মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে। ১৮৫৯ সালের “ক্যারিংটন ইভেন্ট” ছিল মানুষের রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী সৌরঝড়গুলোর একটি। তখন টেলিগ্রাফ লাইন থেকে আগুনের ফুলকি বের হয়েছিল। আজ যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পৃথিবী বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

শেষ কথা

বর্তমান যুগে সূর্যের উপর নজরদারি করা হয় সারাক্ষণ। মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট, সৌর পর্যবেক্ষণ মহাকাশযান আর পৃথিবীর সৌর টেলিস্কোপ সব মিলিয়ে সূর্যের প্রতিটি পরিবর্তন নজরে রাখা হয়। বিজ্ঞানীরা এই তথ্য ব্যবহার করে স্পেস ওয়েদার বা মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেন, যাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এই অশান্ত সূর্যই আমাদের জীবনের ছন্দ ঠিক করে। দিন-রাত, ঋতু পরিবর্তন, জলবায়ু—এসব কিছুই সূর্যের সাথে সরাসরি জড়িত। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময় মেপেছে, ফসল ফলিয়েছে, সভ্যতা গড়েছে।

আমরা প্রতিদিন সূর্যের আলোয় বেঁচে থাকি। অথচ সূর্যের রহস্য এখনো পুরোপুরি জানা হয়নি। আর হয়তো এই অজানাই বিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, নতুন প্রশ্ন করতে শেখায়, এবং আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটিকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

Most Popular