মহাকাশের নীরব গতির সাক্ষী
তিন ঘন্টা ধরে আকাশের দিকে ক্যামেরা তাক করে রাখা—এটা শুধু ধৈর্যের পরীক্ষা নয়, বরং মহাবিশ্বের নীরব গতির সাক্ষী হওয়া। যখন স্টার ট্রেইলের টাইম-ল্যাপসে টানা আলোর রেখা দেখা গেল, আর তার ফাঁকে ফাঁকে দশটা উল্কাপাত ধরা পড়ল, তখন আসলে একই ফ্রেমে ধরা পড়েছে দুই ভিন্ন ধরনের কসমিক ঘটনা।
একটির জন্ম পৃথিবীর ঘূর্ণনে, আর অন্যটির জন্ম মহাকাশের ধূলিকণায়।
স্টার ট্রেইল: আকাশ কি সত্যিই ঘুরছে?
খালি চোখে আমরা রাতের আকাশকে স্থির মনে করি। কিন্তু বাস্তবে আকাশের এই “ঘোরা” আসলে পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণনের ফল। পৃথিবী প্রতি ২৪ ঘন্টায় নিজের অক্ষের উপর একবার ঘুরে আসে। আমরা যেহেতু এই ঘূর্ণনের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তাই মনে হয় নক্ষত্রগুলো যেন আমাদের চারপাশে পাক খাচ্ছে।
ক্যামেরার শাটার যখন কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিট খোলা থাকে, তখন একটি নক্ষত্র তার অবস্থান সামান্য বদলায়। একের পর এক এমন শত শত ছবি বা দীর্ঘ এক্সপোজার মিলিয়ে দিলে সেই নক্ষত্র আর বিন্দু থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে আলোর বক্র রেখা। এটাই হচ্ছে, স্টার ট্রেইল।
মজার বিষয় হলো, এই ট্রেইলগুলো এলোমেলো নয়। যদি ক্যামেরা দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ আকাশমুখী থাকে, তবে সব ট্রেইল ঘুরবে দক্ষিণ আকাশের এক নির্দিষ্ট বিন্দুকে ঘিরে। উত্তর গোলার্ধে একই ঘটনা ঘটে উত্তর আকাশে। মহাকাশ যেন তখন এক বিশাল ঘূর্ণায়মান ঘড়ির ডায়াল।
উল্কাপাত: মহাকাশের ধূলিকণার শেষ দৌড়
স্টার ট্রেইল যেখানে ধীর, ছন্দময় আর নিয়মিত, উল্কাপাত সেখানে হঠাৎ, ক্ষণস্থায়ী আর বিস্ময়কর। উল্কা আসলে কোনো ছুটন্ত তারা নয়। এগুলো মহাকাশে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র পাথর বা ধাতব কণা। অনেক সময় এগুলো বালুকণার চেয়েও ছোট।
এই কণাগুলো যখন প্রচণ্ড বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে, তখন বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে ওঠে। সেই জ্বলন্ত রেখাটুকুই আমরা উল্কাপাত হিসেবে দেখি।
বেশিরভাগ উল্কা কয়েক সেকেন্ডের বেশি টেকে না, আর পুরোপুরি পুড়ে যায় অনেক উঁচুতেই। লং এক্সপোজার বা টাইম-ল্যাপসে উল্কা ধরা পড়লে সেটা স্টার ট্রেইলের মতো বাঁক নেয় না। বরং দেখা যায় সোজা বা সামান্য তির্যক এক ঝলক, যেন কেউ কালো ক্যানভাসে হঠাৎ করে আগুনের আঁচড় কেটে দিয়েছে।
এক ফ্রেমে দুই মহাজাগতিক গল্প
এই ভিডিওতে স্টার ট্রেইল আর উল্কাপাত একসাথে ধরা পড়া মানে, সেখানে লেখা হয়েছে দুই ভিন্ন টাইমস্কেল।
- স্টার ট্রেইল মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী অবিরাম ঘুরছে, নিরবচ্ছিন্নভাবে, লক্ষ কোটি বছর ধরে।
- উল্কাপাত মনে করিয়ে দেয় মহাকাশ মোটেই শান্ত নয়; সেখানে এখনও এলোমেলো ছুটে বেড়ায় অসংখ্য ক্ষুদ্র যাত্রী, যাদের কেউ কেউ হঠাৎ জ্বলে ওঠে আমাদের রাতের আকাশে।
স্টার ট্রেইল ধীর, নিয়মিত, পূর্বানুমেয়। কিন্তু উল্কাপাত ক্ষণিক, হঠাৎ এবং অনিশ্চিত। কিন্তু ক্যামেরার সেন্সরে তারা একসাথে ধরা পড়ে। ঠিক যেমন মহাবিশ্বে শৃঙ্খলা আর অপ্রত্যাশা পাশাপাশি সহাবস্থান করে।
শেষ কথা
রাতের আকাশে ক্যামেরা তাক করা মানে শুধু ছবি তোলা নয়। এটা আসলে পৃথিবীর ঘূর্ণন, সৌরজগতের ধ্বংসাবশেষ আর সময়ের প্রবাহকে এক ফ্রেমে বন্দী করা।
তিন ঘন্টার টাইম ল্যাপস ভিডিওতে ধরা পড়া দশটা উল্কাপাতও মহাবিশ্বের এক ক্ষণিক স্বাক্ষর। মহাকাশ প্রতিদিনই এমন গল্প বলে। আমরা শুধু শিখছি, কীভাবে একটু ধৈর্য নিয়ে সেগুলো শুনতে হয়।
