মহাজাগতিক বুনন ও আইনস্টাইন
সময় আমাদের কাছে যেন এক অন্তহীন বহতা নদী। তার স্রোতে ভেসে চলে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। কিন্তু আইনস্টাইন দেখালেন, সময় আর স্থান আসলে আলাদা কিছু নয়। দুটো মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বিশাল বুনন। মহাবিশ্বে এই যৌথ বুননই হলো স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল।
ভর আর শক্তি সেই বুননে বাঁক সৃষ্টি করে। আর আমরা সেই বক্রতাকে অনুভব করি মহাকর্ষ হিসেবে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বাঁধা আছে স্থান-কালের এক অদৃশ্য সুতোর টানে।
বাস্তবতা নাকি কল্পনা?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্পেস-টাইম কি সত্যিই কোথাও আছে? এটা কি আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতা, নাকি কেবল কল্পনার ছবি?
দর্শনে আছে এক মতবাদ, তার নাম “ইটারনালিজম”। এর মতে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সবই সমানভাবে বাস্তব। আমরা যে বলি, “আজ”, সেটা আসলে এই বিশাল মহাজাগতিক চিত্রকর্মের একটি বিন্দু মাত্র।
ব্লক ইউনিভার্স থিওরি: স্থির মহাবিশ্ব
বিজ্ঞানে একে বলা হয় “ব্লক ইউনিভার্স থিওরি”। এখানে মহাবিশ্বের সব ঘটনা স্থির হয়ে আছে, যেন এক মহাজাগতিক ভাস্কর্য। সময় সেখানে বয়ে যায় না। আমরা শুধু এক ফ্রেম থেকে আরেক ফ্রেমে এগিয়ে চলি। যেন এক মহাজাগতিক সিনেমার দর্শক, এক একটি দৃশ্য ধরে দেখি।
তখন “আগামীকাল” বলে কিছু নেই; সবই আগে থেকে লেখা, কেবল প্রকাশের অপেক্ষায়। অনেকে আবার একে “নিয়তির” সাথে তুলনা করেন।
চেতনা ও সময়ের বিভ্রম
আবার কেউ বলেন, স্পেস-টাইম মহাবিশ্বের স্থায়ী কোনো উপাদান নয়। বরং এটা মানব চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এক বিমূর্ত ধারণা। এর গভীরে হয়তো আছে আরও মৌলিক কোনো সত্য। সেই সত্য থেকেই জন্ম নেয় সময় আর স্থানের বুনন। যেমন সমুদ্রের ঢেউ দেখে মনে হয় সমুদ্র দুলছে, অথচ গভীরে সেটা কেবলমাত্র জলকণার নাচ।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি
আধুনিক পদার্থবিদ্যার কিছু তত্ত্বও এই রহস্যে আলো ফেলে। যেমন লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (LQG)। এই তত্ত্ব বলে, সময়-স্থান হয়তো একটানা নয়। বরং অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণিকা দিয়ে তৈরি। যদি তা সত্যি হয়, তবে মহাবিশ্বকে আমরা একেবারে নতুন রূপে দেখতে পাব।
সময়ের তীর ও অজানার হাতছানি
তাহলে প্রশ্ন রয়ে যায়, কেন সময়কে আমরা কেবল সামনের দিকে বয়ে যেতে দেখি? কেন অতীত হাতছাড়া হয়ে যায়, আর ভবিষ্যৎ রয়ে যায় অদৃশ্য পর্দার আড়ালে? হয়তো উত্তর লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের গভীরতম স্তরে। সেখানে বিজ্ঞান আর দর্শন মিলেমিশে তৈরি করে এক অদ্ভুত আলোছায়ার খেলা।
হয়তো স্পেস-টাইম সত্যিই আছে, আবার হয়তো কেবলই এক বৈজ্ঞানিক মডেল। কিন্তু যেটাই হোক, এটা আমাদের জন্য এক বিস্ময়ের জানালা। সেই জানালা দিয়ে তাকালেই মহাবিশ্বকে দেখা যায় ভিন্ন আলোয়। আর তখনই বোঝা যায়, আমরা মহাবিশ্বের যতটা জানি, তার চেয়েও অসীম অজানা রয়ে গেছে আমাদের সামনে।
