প্রচলিত ধারণা ও বাস্তবতা
আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ নির্দিষ্ট তিথিতে ঘটে—চন্দ্রগ্রহণ হয় পূর্ণিমার রাতে আর সূর্যগ্রহণ হয় অমাবস্যার সময়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি মাসেই তো একবার করে পূর্ণিমা ও অমাবস্যা আসে, তাহলে প্রতি মাসে আমরা গ্রহণ দেখতে পাই না কেন?
এর কারণ বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথের জ্যামিতিক অবস্থানের দিকে। মহাকাশে সব কিছুই একটি নির্দিষ্ট তলে বা প্লেনে ঘুরছে না, আর এখানেই লুকিয়ে আছে রহস্য।
কক্ষপথের জ্যামিতি ও নোড (Node)
সৌরজগতে পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে, আর চাঁদ প্রদক্ষিণ করছে পৃথিবীকে ঘিরে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই দু’টি কক্ষপথ একই সমতলে অবস্থিত নয়। পৃথিবীর কক্ষপথের তুলনায় চাঁদের কক্ষপথ প্রায় পাঁচ ডিগ্রি কোণে হেলে রয়েছে।
মহাকাশে যেখানে এই দু’টি কক্ষপথ একে অপরকে ছেদ করে, সেই দুটি বিন্দুকে বলা হয় নোড (Node) বা রাহু-কেতু বিন্দু। গ্রহণ ঘটার জন্য একটি বিশেষ শর্ত পূরণ হতে হয়:
- সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদকে একই সরলরেখায় আসতে হবে।
- এবং ঠিক সেই সময়ে চাঁদকে অবশ্যই কোনো একটি ‘নোড’ বা ছেদবিন্দুতে অবস্থান করতে হবে।
পূর্ণিমা ও চন্দ্রগ্রহণের শর্ত
পূর্ণিমার সময় চাঁদ থাকে পৃথিবীর এক পাশে এবং সূর্য থাকে ঠিক বিপরীত পাশে। এই সময়ে পৃথিবী মাঝখানে থাকে।
- যদি পূর্ণিমার সময় চাঁদের অবস্থান কোনো নোডে হয়, তবেই পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য এক সরলরেখায় আসে। তখন পৃথিবীর ছায়া সরাসরি চাঁদের গায়ে পড়ে এবং চন্দ্রগ্রহণ ঘটে।
- কিন্তু অধিকাংশ পূর্ণিমায় চাঁদ নোডের সামান্য উপরে বা নিচে অবস্থান করে। ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদকে স্পর্শ না করেই মহাশূন্যে হারিয়ে যায় এবং কোনো গ্রহণ ঘটে না।
অমাবস্যা ও সূর্যগ্রহণের রহস্য
অমাবস্যার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। তখন চাঁদ চলে আসে পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে।
- যদি সেই সময় চাঁদ নোডে অবস্থান করে, তবেই তারা এক সরলরেখায় আসে। তখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর কিছু অংশের ওপর গিয়ে পড়ে এবং সেই অঞ্চলে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়।
- কিন্তু বেশিরভাগ অমাবস্যায় চাঁদ নোড থেকে দূরে থাকে (উপরে বা নিচে), তাই তার ছায়া পৃথিবীতে না পড়ে পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় (misses the earth)। ফলে সূর্যগ্রহণ হয় না।
বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য
অতএব, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক শর্ত হলেও, সেটাই যথেষ্ট নয়। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কেবল তখনই ঘটে, যখন পূর্ণিমা বা অমাবস্যা তিথিটি চাঁদের কক্ষপথের নোডের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
এ কারণেই বছরে মাত্র কয়েকবার (কমপক্ষে ২ বার, সর্বোচ্চ ৭ বার) গ্রহণ দেখা যায়। এই বিরল জ্যামিতিক পরিস্থিতির কারণেই গ্রহণ একটি মহাজাগতিক বিস্ময়কর দৃশ্য। যদি চাঁদ এবং পৃথিবীর কক্ষপথ একই সমতলে থাকতো (কোনো ৫ ডিগ্রি কোণ না থাকতো), তাহলে আমরা প্রতি পূর্ণিমায় চন্দ্রগ্রহণ আর প্রতি অমাবস্যায় সূর্যগ্রহণ দেখতে পেতাম। তখন গ্রহণ আর কোনো বিরল ঘটনা হতো না।
দৃশ্যমানতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
চন্দ্রগ্রহণ দেখা তুলনামূলক সহজ, কারণ যখন গ্রহণ হয়, তখন পৃথিবীর যে অর্ধেকের আকাশে রাত থাকে, সেখান থেকেই তা দেখা যায়। কিন্তু সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদের ছায়া (প্রচ্ছায়া বা Umbra) পৃথিবীর খুব অল্প অংশের ওপর পড়ে। সেই সরু ফালি বা ‘পাথ অফ টোটালিটি’-র মধ্যে থাকলেই কেবল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব, যা বেশ কঠিন।
আমার ৬৫ বছরের জীবনে আমি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখেছি মাত্র দুইবার, অথচ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ দেখেছি বহুবার। সূর্যগ্রহণের বিরল ছবিটি তোলার জন্য আমাকে যেতে হয়েছিল সুদূর টেক্সাসে, আর চন্দ্রগ্রহণের ছবিটি আমি সহজেই তুলেছি আমাদের বাসার পেছন থেকে।
