Thursday, January 15, 2026

জীবনের বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়, মহাকাশ অভিযানের কাহিনী, পদার্থের স্বরূপ, কালজয়ী বিজ্ঞানীদের গল্প - এসব নানা চমকপ্রদ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার লেখাগুলোকে নিয়ে তৈরি করেছি , 'বিচিত্র বিজ্ঞান' নামের এই ওয়েব সাইট। বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ইচ্ছে নিয়েই সহজ-সরল বাংলা ভাষায় লেখাগুলো এই সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।  আশা করছি, দিনে দিনে আরো নিত্যনতুন লেখা যোগ করা হবে।

Homeজীবনের বিজ্ঞানস্মল আরএনএ: কোষের নীরব পরিচালক ও জিন থেরাপি

স্মল আরএনএ: কোষের নীরব পরিচালক ও জিন থেরাপি

কোষের কর্মযজ্ঞ ও আরএনএ

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ যেন এক একটি কর্মব্যস্ত কারখানা। সেখানে প্রতিনিয়ত চলছে অসংখ্য কাজ-কারবার। নতুন প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, পুরানো প্রোটিন ভেঙে যাচ্ছে, সংকেত পাঠানো হচ্ছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়।

এই জটিল কর্মযজ্ঞের পেছনে আছে এক ব্লুপ্রিন্ট, যার নাম ডিএনএ (DNA)। কিন্তু ডিএনএ নিজে একা কাজ করে না, বরং তার বার্তা পৌঁছে দেয় এক বিশ্বস্ত দূতের মাধ্যমে। এই দূতের নাম আরএনএ (RNA)।

এই RNA-এরও প্রকারভেদ রয়েছে:

  • mRNA: প্রোটিন তৈরির খবর পাঠায়।
  • tRNA: সেই নির্দেশ বহন করে নিয়ে যায় প্রোটিন তৈরির কাজে।
  • sRNA: কেউ আবার নিজেই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে অন্যদের কাজ। এই শেষের দলটাই হলো স্মল আরএনএ (sRNA)। এরা আকারে ছোট হলেও প্রভাবের দিক থেকে আশ্চর্যরকম শক্তিশালী।

স্মল আরএনএ: এক নীরব পরিচালক

স্মল আরএনএ বা ক্ষুদ্র আরএনএ হলো এমন সব RNA অণু, যেগুলো সাধারণত ২০ থেকে ৩০ নিউক্লিওটাইড দীর্ঘ হয়। এতই ছোট যে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপেও এদের দেখা যায় না, কিন্তু জীবকোষের ভেতরে এদের ভূমিকা বিশাল।

কোন জিন কখন সক্রিয় হবে, কোন প্রোটিন কতটা তৈরি হবে, এইসব সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে এরা। যেন এক নীরব পরিচালক, যিনি নিজের উপস্থিতি ঘোষণা না করেই নির্ধারণ করেন নাটকের প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি দৃশ্য।

আবিষ্কার ও আরএনএ ইন্টারফেরেন্স

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিজ্ঞানীরা প্রথম লক্ষ্য করেন, কিছু ছোট ছোট RNA অণু জিনের কাজকে থামিয়ে দিতে পারে। ১৯৯৮ সালে অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেগ মেলোর যুগান্তকারী গবেষণায় পরিষ্কার হয়—এই ছোট অণুগুলোই “আরএনএ ইন্টারফেরেন্স” নামে পরিচিত এক প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি।

এই আবিষ্কার শুধু জিন নিয়ন্ত্রণ বোঝার নতুন জানালা খুলে দেয়নি, বরং তাঁদের জন্য এনে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কার। আর সেখান থেকেই জীববিজ্ঞানে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়—স্মল আরএনএ বিপ্লব।

প্রকারভেদ ও কার্যপদ্ধতি

এই স্মল আরএনএ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • মাইক্রো আরএনএ (miRNA)
  • স্মল ইন্টারফেরিং আরএনএ (siRNA)
  • পাইউই-ইন্টারঅ্যাকটিং আরএনএ (piRNA)

তাদের কাজ মূলত একটাই, সেটা হলো ডিএনএ থেকে তৈরি হওয়া মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA)-কে লক্ষ্য করে সেটাকে কখনো ধ্বংস করে দেয়া, অথবা কখনো তার প্রোটিন তৈরির কাজ থামিয়ে দেয়া। ফলে কোষ শুধুই প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করে, অতিরিক্ত কিছু নয়। জীবনের সূক্ষ্ম ভারসাম্য এভাবেই অক্ষুণ্ণ থাকে, কোষের ভেতরের অরাজকতা ঠেকানো যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব

আজ বিজ্ঞান জানে, স্মল আরএনএ শুধু প্রোটিন উৎপাদন নিয়ন্ত্রণেই নয়, বরং ভ্রূণের বিকাশ, অঙ্গের গঠন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই গভীর ভূমিকা রাখে।

অনেক ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ এবং ভাইরাস সংক্রমণের পেছনে রয়েছে স্মল আরএনএর ভারসাম্যহীনতা। বিজ্ঞানীরা এখন এই ছোট RNA অণুগুলোকে থেরাপিউটিক হিসেবে ব্যবহার করার পথে এগোচ্ছেন, যাতে নির্দিষ্ট জিনকে নিস্ক্রিয় করে রোগ সারানো যায়। এটি আগামী দিনের জিন থেরাপির সামনে এক বিশাল সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে।

কৃষি ও রোগ নির্ণয়ে ব্যবহার

উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও স্মল আরএনএ এক নীরব সৈনিকের ভূমিকা পালন করে। তারা শুধু নিজের জিন নয়, বরং বাইরের আক্রমণকারী ভাইরাসের বিরুদ্ধেও প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। যেন ক্ষুদ্র অথচ তীক্ষ্ণ কোনো প্রহরী, জিনোমের অখণ্ডতা পাহারা দিচ্ছে।

চিকিৎসা নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও স্মল আরএনএ দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। রক্ত, লালা বা টিস্যুতে স্মল আরএনএর উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে আগাম রোগ শনাক্তের পথ খুলে গেছে। হয়তো ভবিষ্যতে এই নীরব বার্তাবাহকরাই বলে দেবে মানুষের শরীরের সার্বিক অবস্থা।

উপসংহার

একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, জীবনের সব নির্দেশনা আসে কেবলমাত্র ডিএনএ থেকে। কিন্তু আজ তাঁরা জানেন, সেই নির্দেশনাকে বাস্তবে রূপ দেয় এবং নিয়ন্ত্রণ করে এই ক্ষুদ্র আরএনএ অণুরাই। এরা যেন এক নিঃশব্দ সুরকার, যার অদৃশ্য ছোঁয়ায় জীবনের সিম্ফনিতে তৈরি হয় নিখুঁত সুরের সঙ্গতি।

Tanvir Hossainhttps://bichitrobiggan.com
তানভীর হোসেন ছাত্র জীবন থেকেই বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখি করছেন। সহজ সরল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে বিজ্ঞানে জন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং তরুণ সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা তার লেখার মূল উদ্দেশ্য। তানভীর হোসেনের লেখা দুটো বিজ্ঞান বিষয়ক বই, "শতাব্দীর বিজ্ঞান" এবং "বিচিত্র বিজ্ঞান" পাঠক সমাদৃত হয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular